Friday, February 11, 2011

এই দিনে সেই দিন

আশির দশকে আমরা তখন খুলনায় থামতাম। খুলনা আমার শৈশব এবং কৈশোরের শহর। পৃথিবীর আর কোন শহর এতো বেশি নিজের মনে হয়না। শান্ত এবং স্নিগ্ধ একটি শহর। আমার প্রথম স্কুল সেন্ট জোসেফস, বাসা থেকে হাঁটা দূরত্বে ছিল। আমাদের বাসাটি ছিল ৩৬ আহসান আহমেদ রোড। সেই রাস্তার এক মাথায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আরেক মাথায় ছিল প্রাইমারি টেনিং ইন্সটিটিউট। আর পুরো রাস্তা জুড়ে যেন আমার রাজত্ব ছিল। বরষায় যখন পিটিআইয়ের মোড়ে রাস্তা পানিতে থৈ থৈ কর‌তো, তখন যে আমার কি সাংঘাতিক আনন্দ হতো। সেন্ট জোসেফস স্কুলটাও ডুবে যেতো। তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যেতো। গ্যাব্রিয়েল মল্লিক স্যার নিজে দাড়িয়ে থেকে দেখতেন বাচ্চারা ঠিকমতো বাসায় ফিরতে পারছে কিনা। সেদিন রিক্সায় করে বাসায় ফিরতাম। দুইটাকা ছিল রিক্সা ভাড়া। রাস্তা ডুবে গেলে ভাড়া দুই টাকা, এমনিতে এক টাকা। রিক্সার চাকার স্পোকে পানি ছিটকে যাচ্ছে দেখে খুব আনন্দ হতো। আহসান আহমেদ রোডে বেশ কিছু ব্রিটিশ আমলের বাড়ীঘর ছিল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়ীগুলো সত্যি সত্যি দেখার মতো ছিল। সেই কারণে কিনা জানিনা, এখনো পুরানো বাড়ি দেখলে আপ্লুত হয়ে পড়ি। আমরা একটি পুরোনো একতলা বাড়িতে থাকতাম। দেড়-দুই বিঘা হবে পুরো কমপাউন্ডটা। বাসাটি ছিল সবুজে ঘেরা। অনেক গাছপালা ছিল।
সুন্দর একটি ফুলের বাগান ছিল ঠিক ঘরের সামনে। বাসার সামনেটা আলিঙ্গন করে দাড়িয়ে ছিল একটি বোগেনভেলিয়া গাছ। তার পাশ একটি বড় বাতাবি লেবু গাছ। সেই গাছের বাতাবি লেবু ছিল আমার প্রথম ফুটবল। আমার মায়ের খুব বাগান করার শখ। কামিনী, হাসনাহেনা, বেঁলি, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জবা, ডালিয়া, কত রকমের যে ফুলের গাছ ছিল! প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা রাত জেগে সেই বাগান পাহারা দিতাম। টান টান উত্তেজনা থাকতো। কারণ যারা না বলে ফুল নিতে আসতো, তারা ফুল ছিঁড়ে গাছটা উপড়ে রেখে যেতো। আমরা বাসার কাছেই একটি মন্দির ছিল। সেই মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি হিন্দু লোকালয় ছিল বা সেই লোকালয়কে কেন্দ্র করে মন্দিরটি ছিল। হিন্দু লোকালয় বললাম কারণ পুরানো এলাকা। একটি অদৃশ্য দেয়াল দেয়া ছিল হিন্দু বসতির জায়গাটুকুতে। তার চারপাশ ঘিরে মুসলমান পরিবারগুলো থাকতো। একটি ঘাট বাধানো পুরোনো পুকুর ছিল। সেখানে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই গোসল করতো। আমি সেখানে সাঁতার শিখি। তবে হিন্দু-মুসলমান কোন অস্পৃশ্যতা বড়দাগে ছিল না। নাড়ের গোষ্ঠির লোকজন নিজেদের মধ্যে সেটিকে মালায়ন পাড়া বলতো। আমার অবশ্য সেখানে অবাধ যাতায়াত ছিল। সেখানে শৈশবে অশোক নামে একটি বন্ধু ছিল। সে অবশ্য এখন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরা কেউ কেউ খুব ভোরে ফুল কুড়াতে আসতেন আমাদের বাসায়। সাধারণত আমার ঘুম থেকে ওঠার আগেই। কিন্তু তারা ফুল তুলতেন পরিমিত পরিমানে এবং কেউ গাছ নষ্ট করতেন না। আমাদের বাসার কাছে একটি দোতলা মসজিদ ছিল। সেখানে মাঝে মাঝে রাতে তারাবি পড়তে যাবার অনুমতি পেতাম। সেই মসজিদে তারাবির সময় সমবয়সীরা লুকোচুরি খেলতাম সেটাই আমার মূল আকর্ষন ছিল। সেন্ট জোসেফস স্কুলের প্রাচীর লাগোয়া একটি ক্যাথলিক চার্চ ছিল। মন্দির, মসজিদ এবং চার্চ তিনটিই এক কিলোমিটার রেডিয়াসের ভিতর ছিল। কি চমতকার সহাবস্থান  ছিল। কিংবা ছিল না। হয়তো ছোট বলেই মনে হতো সব শান্তিপূর্ন। তবে বাবড়ি মসজিদ ইস্যুর আগ পযর্ন্ত কোনদিন বড়দাগে কোন কিছু দেখেছি মনে পড়ছে না। তবে তারপর যারা সমর্থবান হিন্দু পরিবার তাদের কেউ কেউ কোলকাতার দিকে চলে গেলেন। একদিন আবিষ্কার করলাম প্রাইম ভিডিওর কর্মচারি আমাদের প্রদীপদা রাতের আধারে হারিয়ে গেছেন। আমার বাবার বেশকিছু অগ্রজ এবং অনুজ সহকর্মী চলে গিয়েছিলেন ওপার বাংলায়। তাঁরা চিঠি লিখতেন যে তাঁরা ওখানেও ভাল নেই। মানাতে পারছেন না। সেসব চিঠির কথা আমি না বুঝেই শুনতাম। আব্বাও বলতেন।
চার্চটি আমার খুব প্রিয় জায়গা ছিল। সবুজের মাঝে সাদা চার্চ। সবুজ, সতেজ এবং স্নিগ্ধ একটি জায়গা। চার্চ থেকে যখন ঢং ঢং ঘন্টা বাজতো আমি আযানের মতোই খেয়াল করে শুনতাম। একজন স্নেহপ্রবণ ইটালিয়ান ফাদার ছিলেন। তার ব্যাগে থাকতো পেন্সিল, স্ট্যাম্প এবং লাটিম। আমি তাকে দেখলেই বলতাম, গিভ মি এনাদার ওয়ান। মানে না বুঝেই বলতাম। তবে তাতে কাজ হতো। সম্ভবত কোন একটি দুধের টিভি কমার্শিয়ালে এই কথাটি ছিল। দুধ খেয়ে খালি গ্লাসটি থাশ করে টেবিলের উপর রেখে একটি ছেলে ওই কথাটি বলতো। ফাদার কোনদিন ইটালিয়ান লাটিম, কোনদিন স্ট্যাম্প বা কোনদিন পেন্সিল-ইরেজার দিতেন। সেগুলো পেয়ে কি অকৃত্তিম আনন্দ হতো! রবিবারদিন সকালে ক্লাস থেকে শুনতাম চার্চের প্রেয়ার সং। সবাই একসাথে গাইতো। সেই গানে আমার শৈশবের স্কুল বেলা ভরে উঠতো। যখন গান শুরু হতো আমাদের ক্লাসটিচার মেরি ম্যাডাম কেমন উদাসী হয়ে যেতেন। অনেক সময় পড়া থামিয়ে দিতেন। সন্ধায় আযানের পর বাসা থেকে শুনতে পেতাম মন্দিরের কীর্তন। আহসান আহমেদ রোডে আমার শৈশবের বছরগুলোতে নিয়মকরে বছরে একবার কাওয়ালি হতো। রাস্তা বন্ধ করে প্যান্ডেল টানিয়ে। বিরিয়ানি খাবার থাকতো। সেটা নিয়ে খুব শোরগোল হতো। তবে লোকজনের উদ্দীপনাও দেখার মতো ছিল। সেটির আয়োজক ছিলেন সম্ভবত আমাদের পাড়ার বাকের ভাই এবং বদি খ্যাত নান্টু ভাই এবং ময়না ভাই। কাউয়ালি উপলক্ষে আমাদের বাসার নারকেল গাছটা খালি হয়ে যেতো। নান্টু ভাই এসে আগেই অনুমতি নিয়ে নিতেন পোলাপান দুএকটি ডাব খেতে চায়। না বলার কোন প্রশ্ন বা সুযোগ কোনটাই ছিলনা। নান্টু ভাই আমাদের মহল্লার মানসম্মান ইস্যুতে জীবনপাত করে দিতেন। তার ভাই ছিলেন আর্মিতে কমিশনড অফিসার, সেটি ছিল তার আরেকটি মনের জোর। স্বীকার করতেই হবে আমাকে স্নেহ করতেন। চকলেট কিনে দিতেন। কখনোবা সাতক্ষীরা ঘোষ ডেয়ারিতে নিয়ে গিয়ে ছানার জিলাপি খাওয়াতেন।
ঈদের দিনটি ৩৬ আহসান আহমেদ রোডের মতো এতো আনন্দের কোনদিন কোথাও মনে হয়নি জীবনে। ঈদ ছিল আমাদের সবার একসাথে হবার উপলক্ষ। আমার মা চাকুরি করতেন। শুধু চাকুরি করতেন না, তার কাজের প্রতি যে নির্মোহ ভালবাসা ছিল তার সিকি ভাগও যদি আমার ভেতর থাকতো। আমি আজ অন্য কেউ হতাম। আমার বাবা তার আইনি পেশার কারণে থাকতেন যশোরে। আমার বড় ভাই ততোদিনে ক্যাডেট কলেজ শেষ করে আর্মিতে। তাই ঈদে আমরা সবাই একসাথে হতাম। উৎসবটি ছিল পরিবারের একান্নবর্তী হবার। আগে ঈদে কি এতো এতো কেনাকাটা ছিল? মনে পড়ছে না। অবশ্যই ছিল, কিন্তু এমন কিনতে কিনতে হাবাতে হয়ে যাবার মতো ব্যাপার ছিল না। ঈদ মানে ছিল জানালা দরজার পর্দা পালটে  যাওয়া, কুশন কাভার বদলে যাওয়া, বিছানার চাদর পাল্টানো। তার মানে এই না, সব নতুন। ঈদের চাঁদ দেখাও একটা বিশেষ ব্যাপার ছিল। চাঁদ দেখতে পারি আর না পারি, চকলেট বোমা এবং তারা বাজি নামের এক প্রকার বাজি নিয়ে আমাদের দারোয়ানের ছেলে মাসুদ এবং আলমের সাথে ছাদে অপেক্ষা করে থাকতাম কখন সেগুলোর স্বদব্যবহার করতে পারবো। ঈদের রান্না আম্মা নিজ হাতে করতেন। রান্নাঘরে সাংঘাতিক ব্যস্ত থাকতেন। আব্বাকে দেখতাম নির্ভার, হাসিখুশি, ভাবলেশহীনভাবে দেশ পত্রিকা পড়ছেন, কিংবা কোন বই পড়ছেন কিংবা টিভি দেখতেন। ঈদ এমনই একটি দিন যাকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহ কোন পড়াশুনা থাকতো না। সেসময়ে স্কুল থেকে কোন হোম ওয়ার্ক দিয়ে রাখলেও আমি কোনদিন করিনি। তা নিয়ে আমার কোন অনুশোচনাও ছিল না।
আমার বড় ভাই পিকো তার লাল রঙের ইয়ামাহ মোটর সাইকেলটি নিয়ে ঈদের ছুটিতে আসতো। আমার মনে হতো আমাদের বাসায় কেউ স্পুটনিক পত্রিকায় দেখা স্পেস শাটল নিয়ে এসেছে। যতোক্ষন সুযোগ থাকতো, সাইকেলটি দাড়ানো অবস্থায় তার উপর বসে বড় হবার খেলা করতাম। আমার বড় ভাইয়ের সাথে আমার বয়সের প্রার্থক্য বেশ অনেক। তাই সেসময়ে ছুটিতে এসে সে যখন বিছানায় উপুড় হয়ে থাকতো তার পিঠে উঠে রাতে বাইক চালানোর প্রাকটিসও করতাম নিঃসঙ্কোচে। আমরা চার ভাইবোন আর আব্বা-আম্মা। আহ! কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো। সকালে বড় মাঠ নামে একটা জায়গায় নামাজ পড়তে যাওয়া হতো। সেটি ছিল খুলনা সার্কিট হাউস ময়দান। সেখানেই ঈদের নামাজ হতো। মাঠটি বেশ বড়। সেই মাঠের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ জায়গা ভরে যেতো মানুষে। আমি তখন বিশিষ্ট নামাজী ছিলাম। আব্বার সাথেসাথেই রেডি হয়ে থাকতাম। আমার বড় ভাই আর মেজো ভাই গাঁইগুই করতো। তারপর পুরো কন্টিজেন্টকে দেরি করিয়ে তারাও আসতো। নামাজের পাটি, চাদর সবকিছু আগে থেকেই রেডি থাকতো। আমি ধরতাম সেগুলো। তারপর রিকসায় করে আমরা বড়মাঠে যেতাম। আমরা সাধারনত পাঁচ-ছয় লাইন পরে জায়গা পেতাম। যথাসময়ে নামাজ শুরু হতো। নামাজে সবাই কমবেশি ভুল করতো, এটা চোখে পড়তো। আমি যারপরনাই তাল মেলানোর চেষ্টা করতাম। আব্বাকে ফলো করতাম। নামাজ ঠিকমতোই শুরু হতো, কিন্তু প্যাথেটিক পর্ব ছিল খুঁতবা। ভিনদেশি ভাষায় কি বলে না বলে কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। তবে সবচেয়ে আকর্ষনীয় অংশটি ছিল মোনাজাত। সাধারনত বাংলায় হতো। সেই বক্তব্য কিছু কিছু ধরতে পারতাম। ইমামসাহেব যখন সবাইকে পাপী ইনসান বানিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন, মাফ চাইতেন বারবার, আমি তখন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তাম।
আমি আসলে কোনকালেই সুরাটুরা খুব একটা পারতাম না। আমি জীবনে প্রথমবার স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনীতে যে বিষয়ে ফেল করি তা ছিল আরবি শিক্ষা। তারপর বার্ষিক পরীক্ষায় সেই আরবি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট ট্যুইশনি পড়ে বিরানব্বই পেয়ে পরিবারের সম্মান রক্ষা করি এবং নিজের পিঠ বাঁচাই। আমার আরবি শিক্ষার হাতে খড়ি একজন মহিলার কাছে। আমার বড় দুই ভাই হুজুরের কাছে আরবি পড়েছিল। তাদের সাথে হুজুর যে বেত এবং কিতাবের ভারসম্য রক্ষা করে একটি মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেটি দেখে আমার মা আমার বোনের সময় এসে এডুকেশন পলিসি চেঞ্জ করেন। ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে একজন হুজুরাইনের আগমন ঘটে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি সেই হুজুরাইন পাই। তিনি বলেছিলেন, আমরা যেন তাকে ম্যাডাম বলে ডাকি। আমরা তাই ডাকতাম। ম্যাডাম বোরকা পরতেন কিন্তু বেশ আধুনিকা ছিলেন। আরবি পড়ার অগ্রগতি নিয়ে কোন জোর জবরদস্তি করতেন না। তাই আমি অনাদিকাল ধরে শুধু কায়দা এবং আমপারা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ম্যাডামের মেয়ে থাকতেন আমেরিকায়। তাই তার চোখে নিউইয়র্কের স্বপ্ন বুদ হয়ে থাকতো। তিনি সৌদিআরবের মহিমার গল্প কোনদিন আমাদের বলেননি। তার মুখেই আমি প্রথম জানতে পারি মহাবিশ্বে নিউইয়র্ক নামে একটি নগরী আছে। যেখানে কোনদিন ইলেকট্রিসিটি যায় না। বিশাল সব অট্টালিকা, সব এলাহি কান্ডকারখানা! কিন্তু নিউইয়র্কে বহু জাতির মধ্যে পর্দানশীন মুসলীম উম্মাও স্বদম্ভে স্থান করে নিয়েছে। সেসময় খুব সম্ভবত টেলিভিশনে “এই সব দিনরাত্রি” নামে একটি ধারাবাহিক নাটক চলতো। যখন সেই নাটক চলতো তার কিছুক্ষন আগে দিয়ে ইলেকট্রিসিটি চলে যেতো। ম্যাডাম আমাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে দরুদ পড়ে পড়ে ইলেকট্রিসিটি ফিরিয়ে আনতে হয়। আমি পঞ্চাশ, পচাত্তর বা একশো দরুদ ধরতাম ইলেকট্রিসিটি ফিরিয়ে আনার জন্য। সত্যি সত্যি নাটক শুরুর আগে বা একটু পরেই ইলেকট্রিসিটি চলে আসতো। আমি বিষ্ময়ে শিহরনে কাঁপতাম যে আমার এমন ক্ষমতা আছে যা আর কারো নেই। নাটক শেষ হবার পর সেগুলো পড়ে বকেয়া আদায় করে ফেলতাম। সেই ক্ষমতা আমি কাজে লাগানোর চেষ্টা করতাম দি ‘এ’ টিম, ম্যাকগাইভার, স্ট্রীট হকস  বা ম্যানিম্যাল দেখার সময় ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে। ম্যাডাম শুধু বাইরেই বোরকা পরতেন, আমাদের বাসায় পরতেন না। তাকে একবার অনেক ধরাধরীর পর তিনি ধর্মসভা নামে একটা জায়গাতে আমাকে পুজা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শর্ত ছিল যে শুধু আমিই যাবো, উনি বাইরে থাকবেন। কিন্তু উনি বোরকা পরে নিমরাজি অবস্থায় শেষ পযর্ন্ত পুজামন্ডপেও গিয়েছিলেন।
সুরাটুরা পারতাম না, এই পটভূমি দিলাম এই কারণে যে ঈদের নামাজের সময় আমার যেহেতু বিড়বিড় করে অভিনয় করা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। তাই লোকজন দেখতাম মনযোগ দিয়ে। নামাজ শেষে আব্বা সিনিয়রিটি অর্ডার অনুযায়ী প্রথমে আমার বড়ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করতেন, সব শেষে আমি। নামাজ শেষে আব্বা বেশ কিছু পরিচিত লোকজনের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এ্যাডভোকেট দেলদার আহমেদ। সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বোধহয় পাকিস্থান আমলে কেউ একজন ছিলেন। আমার এখন মনে নেই। আব্বার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজ এ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী এসে কথা বলতেন। তার মেয়ে জনা রাজ্জাক আমার এক ভাইয়ের সহপাঠি ছিল। সেসময় তার ভেতর চাঞ্চল্য দেখা যেতো। আব্বার আরো দুএকজন বয়স্ক এবং ভারি ভারি চেহারার লোকজনের সাথে আলাপসালাপ শেষ হলে আমরা হেঁটে বাসায় ফিরতাম।
আমার মায়ের অফিসের আয়া ছিলেন ফ্লোরা পালমা। তিনি খ্রীষ্টধরমাবলম্বী হওয়ায় ঈদে মোটামোটি দুইদিন তিনি আমাদের বাসায় থাকতেন। আম্মাকে রান্নাবান্নায় সাহায্য করতেন। তার ছেলে রড্ডিক’দা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। আমি তাকে বিশাল খাতির করতাম। তার সাথে আমার ডিল ছিল একটি গুলতি বানিয়ে দেবার। সম্ভবত আম্মা নিষেধ করেছিলেন তাই আর তিনি আমাকে গুলতি বানিয়ে দেননি। সেই ফ্লোরা মাসি কিভাবে ঈদে আমাদের সাথে মিশে যেতেন এখন খুব অবাক লাগে। একটু বড় হবার পর বাসায় খাওয়াদাওয়া পর্ব শেষ করে নিয়মমতো যেতাম এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম চাচার বাসায় শামসুর রাহমান রোডে। ওনার ছেলে জামি এবং তার ভাগনে-ভাতিজা জয় এবং রনি, এরা সবাই এক বাসাতে থাকতো। আমার ছেলেবেলার বন্ধুরা। ওদের পাশের বাড়িতে থাকতো সজল। কি সাংঘাতিক আনন্দের ঈদ করতাম আমরা! জয়ের মুখে আমি প্রথম টলষ্টয়ের গল্প শুনি। কি কাব্যিক বর্ননা ছিল জয়ের। জয়ের সাহিত্যিক হবার কথা ছিল। হয়েছে ব্যাংকার, তবে পড়াশুনা করেছে সাহিত্যে। রনি হয়েছে সাংবাদিক এবং স্কুল শিক্ষক। সজলের সাথে ধর্ম নিয়ে আলাপসালাপ হতো একটু আধটু। সজল বুয়েট পাশ করা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকায় নিজের ফার্ম আছে। এখন এসব নিয়ে ভাবে কিনা জানা নেই। জামির জীবনে মর্মান্তিক বিপর্যয় হয়। মঞ্জুরুল ইমাম চাচা খুন হবার কিছুদিন পর এক সড়ক দূর্ঘটনায় স্মৃতি বিভ্রম হয় জামির। অনেকদিন পিজি হাসপাতালে ছিল। বহুদিন খোঁজ জানিনা ওর। কারো সাথে মিশতো না। আমি কি স্বার্থপর, নিজের জীবন নিয়েই মেতে আছি!
আম্মার সাথে কথা বলি ফোনে। খুব বেশি নতুন বিষয় থাকে না। একই কথা আসে ঘুরে ফিরে। ঠিকমতো খাই কিনা, নিজের যত্ন নিই কিনা। ফাস্টফুড যেন না খাই। আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। এইসব। মাঝে মাঝে নতুন প্রসঙ্গ আসে কখনো কখনো। বাসার কাজের মেয়ে মিনা পালিয়ে বিয়ে করেছে একটি ছেলেকে। পাত্র হাবিব, এমএম কলেজ থেকে মাস্টার্স করা। থাকার জায়গা ছিল না, তাই হাবিব আমাদের বাসায় থাকতো। বিয়ের ব্যাপারটি সত্যি কিন্তু পাত্রপাত্রী স্বীকার করেনি এখনো। আমার মার টেনশন মিনা এখন চলে গিয়ে আলাদা বাসা করবে হাবিবের সাথে। আম্মার সাথে গৃহ প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে পলিসি আলোচনা করি, মিনা এবং হাবিব দুইজনই গ্রামের। মেয়েটার একটা এমএ পাশ ছেলের সাথে প্রেম করে বিয়ে হলো, ব্যাপারটা কত চমতকার হলো। আমাদের কর্তব্য ওরা চলে যেতে চাইলে কিছু দিয়ে থুয়ে নতুন সংসারে সাহায্য করা এবং চলে যেতে উৎসাহিত করা। মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত হই, এতো দূর থেকে ফোন করে এসব নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে না। কিন্তু বুঝি এগুলোই আম্মার প্রায়োরিটি টপিক। তখন শুধু হুঁহুঁ করি অন্যমনস্কভাবে। সেদিনও এসব কথাই বলছিলাম। আম্মা বললো, বাসায় কুরআন খতম এবং মিলাদ পড়ানো হয়েছে। অন্যমনস্কভাবে বলি, খুব ভাল হয়েছে। তারপর – মিলাদের পর ওহী আর রাজ বনানী কবরস্থানে গিয়ে পিকোর কবর জিয়ারত করে এলো। এতিম খাওয়ানো হয়েছে। আমি কিছু না বলে, হুঁ হুঁ করি। আম্মা এবছর একা ঈদ করছে। যশোরে। আমার নানী আমার মায়ের উপর নির্ভরশীল, সে ঢাকায় এসে থাকতে পারে না। আম্মাকেই তাই যেতে হয়। আমি হিসাব মিলাতে চেষ্টা করি স্নেহ-ভালবাসা এগুলো আসলে কি উর্দ্ধমূখী নাকি নিন্মগামী? ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। তবে, এটুকু বুঝি ঈদ আসলে ছোট বেলায়ই সবথেকে আনন্দময় হয়। বড় বেলায় বুঝে গেছি এই আনন্দের ভিতরে কী আছে। সেই শৈশবের ঈদে আমার আর কোনদিন ফেরা হবে না। তা না হয় না হোক, আমি ঈদের প্রথম শুভেচ্ছা পেয়েছি অগ্রজ, বন্ধু এবং সহকর্মী বান্দরবানের গ্যাব্রিয়েল ত্রিপুরার কাছ থেকে। গ্যাব্রিয়েলদা বলেছেন, ঈদ হলো একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালবাসার বন্ধন শক্ত করার একটি চমৎকার সুযোগ যেখানে মানুষ পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখতে পারে। প্রত্যাশা রইলো সবার ঈদ প্রিয়জনদের সাথে আনন্দে কাটুক। … আমি অবশ্য ঈদ বলতে পুরোটাই খানাপিনা আর আড্ডা বুঝি।
আজ ঈদ, আজ মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ।

No comments:

Post a Comment