Friday, February 11, 2011

কিংকু ইবনে কুদরতে এলাহী


একদিন ইনবক্স খুলে দেখি মেসেজে লেখা, বস আসতেছি। এমনিতেই পক্ক বয়সে বন্ধুবান্ধব খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। তার উপ্রে খোট্টারদেশে হইলে তো কথাই নাই। জুন মাসের ছয় তারিখে অটোয়ার মুখ উজ্জ্বল করে এসে হাজির হইলেন তিনি নোভা স্কোশিয়ার শিয়াল গ্রাম থেইকা। ওইদিন আবার অটোয়ায় একটা গেট-টুগেদার আছিল। তারে নিয়ে গেলাম সেইখানে। লকিভুলও (রকিব) তারে দেইখা এক্কেরে গদগদ। তারপর সে ভাবী আর বাচ্চাদের একগাদা ছবিটবি তুইলা এলাহি কান্ডকারখানা। পার্লামেন্টের সামনে গিয়া পাপ্পারাজি ক্যামনে করতে হয়, এইসব টুকিটাকি নিয়া ক্যামেরাবাজির উপ্রে একটা টেকনিক্যাল লেকচারও দিয়া ফেললো আমারে। চাকরি নিয়া অটোয়ায় আসছে, পরদিন থেকেই দৌড়ঝাপ। তারপর থেইকা মাঝেমাঝে দেখা হয় আর টুকটাক কথা। ফেইসবুকে মাঝেমইধ্যে হাসিঠাট্টা কেলানি চলতে থাকলো একটু-আধটু। এরমইধ্যে একদিন দেখি পুরাই সুঁই হয়ে আইসা ফাইল হয়ে বাইর হইতেছে। আমার সব বন্ধু-বান্ধব তার বগলদাবা হয়ে গেছে। ব্যাপারটা খুব একটা সুনজরে না দেখলেও বৃহত্তর শান্তির জন্যে মাইনা নিলাম। তবে আমার আর কিছু বলতে হয়নি কাউকে, পোলাটা বকবক বকবক কইরা মুটামুটি মানুষজনের কানের খৈল নাড়ায় দিসে।
জুলাই মাসে একদিন রাত এগারোটার দিকে ফোন, বস একটু ঝামেলা হইছে। প্রিন্টার নষ্ট। কাল আম্রিকার ভিসার ইন্টারভিউ। অনলাইন এ্যাপোয়েন্টমেন্টটা প্রিন্ট নেওন লাগবো। চইলা আসতে বললাম। সেদিন তার কপাল ভাল আছিলো, আমরা সবাই তখনো ক্যাম্পাসে। ইউনিভার্সিটিতে ইউনিসেন্টারের (মানে টিএসসি টাইপ) দোতলায় গ্রাড স্টুডেন্টদের জন্য একটা শুদ্ধি ঘর আছে। সেইখানে পাক্ষিক শুদ্ধি আসর বসে, বইসা দুই সপ্তাহ ধরে যে যা পাপ করে সেগুলো ধুইয়া পরিষ্কার করা হয়। তো সে আইসাই কিসের প্রিন্ট কিসের কি, গোস্বা কইরা কয়, আমারে ডাকলেন না ক্যান আপনারা? কইলাম, তোর তো অফিস কাল। কয়, তাতে কি? আমি রাইত ২টা পযর্ন্ত জাগি। ততোক্ষনে রাত বারোটা বাজে, শুদ্ধিঘর বন্ধ। তারপর প্রিন্ট নিতে আমার এক বন্ধুর ল্যাবে নিয়ে গেলাম প্রথমে, স্টেইসি বিল্ডিং। কাজ হইলো না, আমার বন্ধুর ভাল প্রিন্টার থেকে হটাৎ কইরা প্রিন্ট বাইর হয় না। কুদরতে এলাহীর প্রিন্ট হইতেছে না, সেইটা ব্যাপার না। এইটা হইলো ইউনিভার্সিটির ইজ্জতের ব্যাপার। সে আবার ঠেস দিয়ে কয়, কানাডার ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটির এই দশা?! শুনলে ক্যামন লাগে মিজাজটা, তাও চাইপা গেলাম! নিয়ে গেলাম ল্যোব বিল্ডিং-এ আমার অফিসে। সেইখানেও প্রিন্টার মোড়ামুড়ি কর্তে কর্তে প্রিন্টার কাইত হইয়া পড়লো, কেস প্রায় ফাইনাল। ইজ্জ্বতের ফালুদা হইতে আর মাত্র এক সিকি বাকি। তারপর অনেক গুতাগুতি কইরা ঠিক হইলো। কিন্তু গুনে গুনে ঠিক চার বা পাঁচটা পেইজ আছে। শেষমেষ কাজ হইলো। কিন্তু এইখান থেইকা তারে নিয়া ভেজালের শুরু।

টুকটাক দেখা হয় মাঝে মাঝে। সে তখন সিসিবি নিয়া কথা কয়। চাওয়ালা, ঠোলা, হতাহত, কনফু, দিহান, মেলিতা. সাইফ ভাই, লাবলু ভাই, ফয়েজভাই, কাম্রুলাসান, সেন্ট জোনসবাসী, গুহাবাসী থেকে শুরু করে বিখ্যাত, কুখ্যাত, পপুলার সব ব্লগারের নামঠিকুজি নিয়া কথা কয়। এমন কি দাজ্জাল-গাজ্জাল কিছুই বাদ রাখেনা! ইনফ্যাক্ট, কুদরতে এলাহি সিসিবির জন্ম থেইকাই নিয়মিত এইটারে ফলো কইরা যাইতেছে। যাইহোক, আবার একদিন হটাৎ ফোন। বস, আপ্নের কম্পুটারটা ইকটু লাগবে। অপারেটিং সিস্টেম ক্রাশ করছে। সেইদিন আমার এক ডিনারের দাওয়াত ছিল। তারে আমার কম্পুটার দিয়া সেইখানে যাবো বইলা রিড্যু সেন্টারে আসতে কইলাম। আমি তার দিকে আমার ল্যাপটপ আগায়া দিতেই কইলো, আমি ভাবছিলাম আপ্নের সামনে বসে কাজ সাইরা ফেলবো। ল্যাপটপ তো একটা পারসোনাল জিনিস। আপনি এমনে দিতেছেন দেইখা খুব অবাক হইলাম। তবে আমি ভিত্রের কিছু ঘাটাঘাটি করবো না, টেনশন নিয়েন না। আমি বললাম, ঘাটাঘাটি করলেও কোন প্রব্লেম নাই। সে হেঃ হেঃ হেঃ করে হাসতে থাকলো। বুঝলাম বাঙ্গালি মুসলমানের মন ময়লা। আর কিছু না বইলা আমি দাওয়াত খাইতে গেলাম। ডাউসলেকের কোলে ম্যাক্সিকালি রোজা নামের একটা রেস্টুরেন্টে। বইসা ফাহিতাস আর আখের রস খাইতেছি। আবার ফোন – কি অবস্থা, কি করতেছি। একটু বিরক্ত হইলেও ভাল করে কইলাম, মাইনসে রেস্টুরেন্টে আইসা কি করে? সে কয় – না, না, খান আপনে। খাওয়া শেষ হইলে একটা ফোন দিয়েন। কাজ আজকের মতো শেষ। … আমি খাওয়া শেষ করে আবার তার সাথে দেখা করতে রিড্যূ সেন্টারে গেলাম। দেখি অন্য চেহারা। কয় আমার কম্পুটারও নাকি ইন্তেকাল ফরমাইছে, সিস্টেম ক্রাস করছে। ভাবছিলো আমি ছাইড়া দিবো। আড়েধ্যাড়ে বুঝায় দিলাম যে তুমি টেকি মানুষ। তোমারে ভাল ল্যাপি দিসি। এখন ভেজাল হইছে, ড্যাটা সব উদ্ধার কইরা নতুন অপারেটিং সিস্টেম ইনস্টল কইরা তাপ্রর যেমন নিসিলা তেমনে ফেরত দিবা। সে একটু মোড়ামুড়ি করলেও মাইনা নিল। তার একদিন পর ল্যাপি ঠিক হইলো কিন্তু সে আরেক কাহিনি। তার ভাষায়, “সে এক বিশাল ইতিহাস, ঘরে ছিলনা কেরাসিন …” বোনাস হিসাবে আমার পোর্টেবল এক্সট্রা হার্ড ড্রাইভটা দুই সপ্তাহের জন্য হারায় ফেললাম তার সাথে সাক্ষাতের সময়। যাইহোক, তার্পর থেকে আমার ল্যাপির ব্যারাম আর যাইতেছে না।

আমাদের এক বন্ধু আছে। খুব ভাল লোক, মেধাবী ছাত্র। গাঞ্জার উপ্রে একটা ফাইনাল পেপার লিখে তার পিএইচডির একটা কোর্সে এ-প্লাস পাইছে গতবছর। অনেক কোর্সেই সে এ-প্লাস পাইছে, কিন্তু সেই কোর্সটা নিয়েই তার গর্ব সবথেকে বেশি। দিনরাত ল্যাবে পইড়া থাকে। রসায়নশাস্ত্র নিয়া গবেষনা করে। আমাদের শুনায় যে কয় হাজার রিএ্যাকশন কইরা নাকি পাঁচটা না সাতটা রেজাল্ট পাইছে মাত্র। আমরা সেইসব গল্প শুনি। তার সাথে দেখি কুদরতে এলাহীর ব্যাপক মাখামাখি, তুমুল গুলতানি মারা। কি কি সব যানি কয়, পিংক-ফ্লয়েড, রজার ওয়াটারস, ডেভিড গিলম্যুর, দ্য ওয়াল, উইশ ইউ ওয়্যার হিয়ার, দ্য ডিভিশন বেল, নফলার, মেটালিকা, জিএনআর, ব্লা ব্লা কি সব কয়। তার দুইতিনদিন পর আমার সেই রসায়ন বন্ধু শয্যাশায়ী। তারপর রাজ্যের সব ডাক্তার কোবরেজ তাবরেজ ঝাড়ফুক কইরা দেখা গেলো কোন কারণ ছাড়াই নগদের উপ্রে ফুসফুসে একটা ফুটা বাইর হইলো, চিকনা টিনটিনা মানুষটার নাকি কোলস্টরেল বাইড়া গেছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি ম্যালা ব্যারাম। তারপর আমার রসায়ন বন্ধু আমারে একদিন ডাইকা কয় তোর ওই ছাগলাদাড়ি বান্দরমার্কা ফ্রেন্ডরে যদি কার্লটনের আশপাশে আর দেখি তাইলে তোর কপালে খারাবি আছে, অসুখের মায়েরেবাপ! কোবরেজ নাকি বলছে যে ওই ছাগলা দাড়ির সাথে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুরই তার জীবনে নিয়ামত হিসাবে আইসা পড়ছে।
একদিন ঠিক করা হইলো। ফল সিজন চইলা যাইতেছে। চারদিকে গাছপালায় এতো সুন্দর রঙ। সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। আমরা মন্ট-ট্রামব্লাহ বইলা একটা পাহাড়ি জায়গা আছে সেইখানে বেড়াইতে যাবো। সারাদিন সেইখানে থাকবো। গাড়িতে একটা সিট ফাঁকা ছিল। কারে নেয়া যায়, কারে নেয়া যায় – তার্পর কয়েকজন বললো যে কুদরত-এ-এলাহী একা থাকে, ওরে নিয়ে যাই। পরদিন সকালে আমরা যাবো নয়টায়। ঘন্টা তিনেকের জার্নি। তিনটা গাড়ি। সবাই ঠিকঠাক মতো উপস্থিত। রওনা দিলাম। কিছুদূর যাবার পর একটা গাড়ির স্টিয়ারিং লক হয়ে গেল চলতে চলতে। ডাইনে বায়ে কোনদিকে যায় না। কোনরকমে সেই গাড়ি থামায়ে তার্পর গাড়ির ডাক্তার-কোবরেজ সব কইরা গাড়িটারে সুস্থ কইরা রওনা দিতে দিতে দেখি যে দুপুর গড়ায়ে গেছে। আমরা কত জায়গায় বেড়াতে গেছি কোনদিন এমনতরি হয়নাই। একজন বললো যে, শালারে ধইরা নামায় দেই গাড়ি থেকে। এরে নিয়ে সবসময় একটা ভেজাল হয়। কথা পাক্কা। খালি সেদিন জন লেননের জন্মদিন ছিল বইলা মাফ কইরা দিলো সবাই।

বিভিন্ন সময়ে বন্ধুবান্ধবদের অনুরোধ চাপে তাদের সুন্নতি খৎনা, জাতীয় দাম্পত্য দিবস, অফার দিবস, খালা শাশুড়ির জন্মদিন, হ্যানাত্যানা প্রভৃতিতে ডাকা হইছে আমারে ছবি তুইলা দিতে। আমি হাসিমুখেই যাই। তো এই ছাগলাদাড়িটারেও নিয়া যাই। মেইনলি একা ছবি তুলতে একটু বোরিং লাগে প্লাস খানাপিনা পাইলো পুলাটা। এ্যারে যাবার কথা বললে সে খাড়ার উপ্রে ইয়েস কইরাই বলে, কখন যাইতে হবে? তারপর আবার একটু ভাব নিয়া বলে, আমিতো তখন ঘুমাবো, আমাকে ফোন করে উঠাইয়া দিতে হইবো। আবার একটু মুড়ামুড়িও করে – কনফার্ম কইতে পারতেছি না। আচ্ছা দেখি। জানাবো। … এরপর ঠিকই যায়। আমি ভাবি হয়তো লজ্জা পায়, তাই এমন করে। একদিন দেখি এইসব সামাজিক অনুষ্ঠান থেইকা টুকাইয়া টুকাইয়া তিনটা সখের মডেলকন্যা বাইর কইরা দিনব্যাপি ফটোশুট করে বেড়াচ্ছে অটোয়ার রাস্তায়, পার্কে, নদীর পাড়ে, যাদুঘরের লনে। জিঞ্জেস করলাম, কেম্মে কি? কয়, আরে এইটা কোন ব্যাপার না, কোন অনুষ্ঠানে যাইয়া খালি একটা পোট্রেইট ছবি তুলবেন একটু ব্রাইট ধরনের, তার্পর যাইয়া সেই ছবি দেখাইয়া কইবেন যে, আপনার পোট্রেইটে একটা দারুন এ্যাসথেটিক পারসপেকটিভ আছে, দিস ইজ ভেইরি রেয়ার। বইলা একটু ভাব নিয়া অন্যদের ছবি তুলা শুরু করবেন এ্যাজ ইফ সেই বালিকারে আর দেখতেছেন না। তার্পর কাজ অটোমেটিক হয়ে যাবে। আমি শুইনা পুরা তব্দা খাইয়া গেলাম। এইসব বুদ্ধি আমার মাথায় খেলে নাই ক্যান!

একদিন আমারে কয়। আমার আর চাকরি ভাল্লাগে না। আমি যামুগা। জিগাইলাম, কই যাবি? কয়, যার দিকে দুই চোখ যায় সেদিকে। কইলাম, মানে? কয় যে, নাহ, আর কই যামু। স্কুলে ব্যাক করবো। পিএইচডি করবো। চাকরি হাশফাস লাগে এক্কেরে। স্কুলই ভাল। কইলাম, ভালোই তয় মিনিমাম পাঁচ-ছয় বছর, অনেকেরই বোরিং লাগতে শুরু করে। কয়, আমার লাগবো না, স্কুলে অনেক মোরাল আছে, বিনোদনও আছে …। তারপর ঘটা কইরা গত ফ্রাইডেতে হ্যালুইন এন্ড ফেয়ারওয়েল পার্টি একসাথে দেয়া হইলো কুদরত মিয়ার যাওয়া উপলক্ষে। অনেক মজাও হইলো। এরপর শোনা গেল অনেকেরই পেটে মোচড় দিয়ার পর ছোটঘরে দৌড় লাগাইতে হইছে। এন্মেতে সাধারনত খাবারে এখানে তেমন প্রবলেম হয়না। কিন্তু ওইদিনই হইলো। কেউ আর ওরে দোষ দেয়নাই এইদফায়, চইলাই যাইতেছে যখন।

শেষে কাল বিকালে আমি আর আমার এক বন্ধু উচ্ছ্বাস ওর বাসায় যাইয়া বললাম, অনেক হইছে। এইবার মাফ কইরা দে, ভাই। বিদায় হ এইখান থেইকা। হাসিহাসি মুখে কুদরতে এলাহী সব লাগেজ এক এক করে গাড়িতে তুললো। তারপর বলে যে একটু চেক কইরা দেখি বাসায় কিছু রাইখা যাইতেছি কিনা। চেইক কইরা আইসা বলে, এভরিথিং ইজ সো ফার সো গুড, চলেন। তারপর বিসমিল্লাহে মাজরাহা … বইলা এয়ারপোর্টে রওনা দিলাম একসাথে। কুদরতে এলাহী গাছ দেখে, রিড্যু নদী দেখে, রাস্তায় বালিকা দেখে। মুগ্ধ হয়। কাঁচ তোলা গাড়ির ভিতরেই হাত নাইড়া নাইড়া বলে, বিদায় সুন্দরীরা। বিদায় অটোয়াবাসী। আমরা তার কারবার দেখি আর হাসি। ফ্লাইট বিকাল ৬:১০ মিনিটে। সাড়ে চারটায় তারে নামানো হয়। সব ঠিকঠাক। কিন্তু এয়ারপোর্টে আইসা দেখা গেলো যে কুদরত-এ-এলাহির পাসপোর্ট, ল্যাপটপসহ সব দরকারি কাগজপত্রের ব্যাগ বাসায় রাইখা চইলা আসছে। ফ্লাইট ছাড়তে বাকি এক ঘন্টা চল্লিশ মিনিট। আবার যাওয়া আসা পাক্কা এক ঘন্টা দশ মিনিট।

শুরু হইলো ফিরতি যাত্রা। আমি কইলাম, আলহামদুর সুরা তিনবার, দুয়া কুনুত তিনবার আর আইতালকুরছি চাইরবার পড়। কুদরকে এলাহী কয়, আইতালকুরছি তো এখন মুখস্থ নাই। ফিসফিস কইরা আওড়াতে থাকলাম, “লাইফ রিভিলস ইটসেলফ রাদারদ্যান বিয়িং এ্যাংশাসলি কোরিওগ্রাফড” … আমরা যতো তাড়াতাড়ি করি, রাস্তায় একটু পরপর খালি লালবাতি জ্বইলা ওঠে। এট লাস্ট, ওর বাসায় আসার পর পাওয়া গেলো সেই ব্যাগ। এখন এয়ারপোর্ট পৌছাইতে হবে। চেইক ইন করাইতে হবে। উচ্ছ্বাসের আইফোনে এয়ার কানাডা চেইক ইন করতে গিয়ে দেখা গেল ফোনের চার্জ আছে মাত্র ৯%। এদিকে আবার ফ্লাইটের অনলাইন চেইকইন ক্লোজ কইরা দিসে। তারমধ্যে আবার গাড়ির তেলের মিটার লালবাতি দেখানো শুরু কইরা দিলো। রিজার্ভ দিয়ে চলতেছে। প্রতিটা সেকেন্ডের মূল্য বিশাল। এক্কেরে যেখানে গেলে বাঘের ভয়, সেইখানেই রাত পোয়ায়।

কুদরত-এ-এলাহী ছটফট করা শুরু কইরা দিলো। আমরা তারে অভয় দিয়ে যতোই কই, ভয় পাইস না। এইখানে যদিবা ফ্লাইট মিস হয়, আমরা তোরে মনট্রিয়াল নিয়া নামায়া তার্পর লন্ডন ফ্লাইটটা ধরায়া দিবো। কিছুতেই কিছু হয়না। যে মানুষ জোরে জোরে চিৎকার করে চিন্তা করে, তারে এসব সময় ঠেকায় রাখা মুশকিল, স্বান্তনা দেয়া খুবই কঠিন কাজ। তারপর সে প্যানিকের ঘাপানে একসময় বইলা বসলো যে, এইবার যদি ফ্লাইট ধরতে পারি, খুদাতালা আমি অর্ধেক ভাল হয়ে যাবো। নামাজ-কালামও ঠিকঠাক মতো পড়বো। এইসব কর্তে কর্তে আবার পৌছলাম এয়ারপোর্ট। ট্রলি টাইনা, ব্যাগ উঠায়া, হ্যান্ডসেক কইরা কুদরত দিলো দৌড়। পুরা টান টান উত্তেজনা। প্লেইন উড়তে আর ঠিক ২৫ মিনিট বাকি। চেইক ইন করা হয়নাই। আমরা দুই বন্ধু গাড়িতে উইঠাই কইলাম, শালার ভাই একটা মাল। যেইখানে যায় একটা কারবার কইরা ছাড়ে। এরপর আমরা প্রথমে গ্যাস স্টেশনে যাইয়া গাড়ির গ্যাস ভরলাম, যদি আবার মনট্রিয়াল যাওয়া লাগে। সময় হিসাব করতে থাকলাম যদি অটোয়ার ফ্লাইট মিস করে তাইলে কেম্মে কি করবো। তারপর কুদরতরে ফোন লাগাইলাম। কয়, ১০ মিনিট পর কল দিতে। ফ্লাইট ছাড়তে পাঁচ মিনিট বাকি। আমরা এয়ারপোর্টের পাশের একটা টিম হর্টনসে যাইয়া বইসা আবার কল দিলাম। এইবার কয়, ডান! আমি ফাইনালি যাইতেছি। তয় কাহিনি আছে। টেকনিক্যাল ডিফিক্যালটির জন্য আমার মন্ট্রিয়াল ফ্লাইট ক্যানসেল হইছে। তাই আমারে লাস্ট মোমেন্টে চেক ইন করতে দিসে। কাউন্টারের বেটি খুব কড়া কড়া কথা শুনাইছে প্রথমে, তার্পর মারাত্মক হেল্প করছে অবশ্য। তয় ফ্লাইট চেঞ্জ কইরা দিসে। এখন যাবো টরোন্টো, তার্পর সেখান থেকে লন্ডন। সস্তির নিঃশ্বাস ছাইড়া কইলাম, সাউন্ডস গুড! কিন্তু অন্টারিওর মাটিতে আর পা দিলে তোর টেঙ্গি ভাইঙ্গা হাতে ধরায় দিবো। এইবার কুদরত-এ-এলাহী খ্যাক খ্যাক কইরা হাসা শুরু কইরা দিলো। তারপর এয়ারপোর্টের ফ্রি ইন্টারনেট পাইয়া আমাদের ট্যাগাইয়া স্ট্যাটাস দিল, “দ্যাট ওয়াজ কাইন্ড অফ ফান, নো?” আমরা কইলাম, ফান ইনডিড! এরপর টরোন্টোর পিয়ারসন এয়ারপোর্ট থেইকা আবার আপডেট, এক সুন্দরী নীলনয়নার পাশে মাটিতে বইসা ফেইসবুকিং কর্তেছি আর বোর্ডিং-এর জন্য অপেক্ষা করি। তার্পর আবার লিখলো, প্লেনে উঠতে ডাকতেছে, যাইগা।

কুদরতে-এ-এলাহীরে শেষ পর্যন্ত পয়লা নভেম্বের অটোয়া থেকে খেদানো গেল। তবে নেক্সট টাইম এর সাথে দেখা হইলে তাবিজ দিয়া শরীল বাইন্ধা তার্পর বাকি কথা। এইরকম রদ্দি আইটেমের পাল্লায় আমি জীবনে পড়িনাই। আপাততঃ ঢাকাবাসী সাবধান দুই মাসের জন্য!

***
[যারা কিংকু এবনে কুদরতে এলাহী - কে চিনেন না, তাদের জন্য বলছি। সে লোক খারাপ হলেও মানুষ ভাল। ... অটোয়া উইল মিস ইউ, কিংকু। পিএইচডির বাঁশ আশাকরি মজাদার হবে। শুভকামনা।]

***

ছবি: কিংকুর ছবি সুজন চৌধুরীর আঁকা।

***

পরিশিষ্ট:
অনেকই মনে করতে পারে কিংকু কেডা না কেডা তারে নিয়া এতো মাতামাতি করার কি আছে? ইনফ্যাক্ট আমি লেখার সময় মনে করতেছিলাম যে আপদ বিদায় হইছে এ্যারে নিয়া আবার লিখতেছি ক্যান? তারপর কিংকুর ঢাকা থেইকা মেইল পাইয়া নিশ্চিত হইলাম ব্যাপারটা মোটেও হ্যালাফেলার না। এইটা দেশপ্রেমের অংশ, কারণ কিংকু এখন ঢাকায়। যাইহোক, বাকিটা কিংকুর বয়ানে শুনলে আরো কিলিয়ার হবে -

“কাহিনি কিন্তু ঐখানেই শেষ হয় নাই, কুয়েতে আরো বিশাল মজা হইসে … খাড়ান বলি …
আমার কুয়েতে ট্রাঞ্জিট ছিল চল্লিশ মিনিটের, বর্ডিং লন্ডন থেকেই নেয়া, সো চল্লিশ মিনিট শূড হ্যাভ বিন এনাফ …
প্লেন টাইমেই নামলো, টার্মিনালে ঢুকে দেখলাম পচিশ মিনিট আছে তখনো … ইনফো বোর্ড খুঁজে বের করে দেখি টাইম বিশ মিনিট পিছাইসে, সো আমার হাতে

একচুয়ালি পাচচল্লিশ মিনিট আছে … গেট খুঁজে বের করলাম, দেখি সেখানে শ্রীলংকার একটা ফ্লাইটের বর্ডিং চলে, সব লোকজন ভীড় করে ঢুকতেসে … নোটিস বোর্ডে লেখা “কলম্বো-> বোর্ডিং; ঢাকা -> রিস্কেজুয়েল” … আমি ধরে নিলাম কলম্বোরটা শেষ হওয়ার পর ঢাকারটা ডাকবে, গতবার আমার বাহরাইনেও এই টাইপ অভিজ্ঞতা হইসিলো, আমি জানি এইখানে একটু দেরি হয়েই থাকে, ব্যাপার না … আমি খুঁজতে খুঁজতে একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার লাগানোর পাওয়ার পোর্ট পেয়ে গেলাম, গেট থেকে বেশ দূরে … ঐখানে ল্যাপটপ লাগায়ে মাটিতে বসে ওয়ারলেস খুঁজে বের করে ফেসবুকে ঢুক্লাম …
এর মাঝে দেখি ফ্লাইটের টাইম প্রায় হয়ে গেসে, তাও রিস্কেজুয়েল লেখা বদলায় না, বোর্ডিংয়ের কথাও কয় না … মনে মনে ব্যাটাদের মুন্ডুপাত করতেসি, এইসময় দেখি এয়ারপোর্টের এক বেটি খালি গলায় গেটের সামনে এসে আমার নাম ডাকে … কাহিনী কি?

জিনিস্পত্র গুটায়ে দিলাম দৌড় … কাছে এসে শুনি প্লেন নাকি ছেড়ে দিতেসে … তড়িঘড়ি করে ঢুকতে নিসি, দেখি ঐখানে জিনিস্পত্র স্ক্যানিং হবে … আমি ল্যাপটপ বের করতে নিসি, সিকিউরিটির ব্যাটা কেইস বুঝে বললো তোমার চেকিং লাগবে না, তুমি ঐ কাউন্টারে যাও তাড়াতাড়ী … দিলাম দৌড় … গেটে গিয়া পাসপোর্ট দেখাইতেই মহিলা কয় তুমি ছিলা কই? প্লেন তো চলে যাচ্ছে …

আমি গল্প বানাইতেসি, এর মাঝে মহিল ওয়ারলেসে যোগাযোগ করে বললো লাস্ট যাত্রীরে পাওয়া গেছে, নেয়া যাবে? তারপর কি সব শুনে আমারে বললো এদিক দিয়া যাও …
টানেলে ঢুকলাম, শেষ মাথায় দেখি বিমান নাই, বাস … সেই বাসে উঠলাম, সাথে এক ইন্ডিয়ান ড্রাইভার … সে রানওয়ের উপর দিয়ে বাস ছোটাইলো, তারপর আমারে কয় কাঁহা খো গ্যায়া থা তুম? :-D

যাই হোক, প্রায় মিনিট পাঁচকে ফুল স্পীডে ছুটে রানওয়ের শেষ মাথায় প্লেন পাওয়া গেল, সেটার দরজা খোলা, সিঁড়ি লাগানো, এক স্টূয়ার্ড কোমরে হাত দিয়া খাড়ায় আছে … আমারে কয় ছিলা কই? যাই হোক, সীট দেখায় দিল, লাগেজ রেখে বস্লাম, প্লেন ছাড়লো, বিশ মিনিট লেটে :-D

পরে কাহিনী শুনলাম, [এইটা বাংলাদেশের ফ্লাইট বলে হেলাফেলা করেই হয়তো] প্লেন টানেলের কাছে নেয় নাই, যাত্রীদের বাসে করে আনছে; এবং সেইটা কলম্বোর বোর্ডিং শুরু হওয়ার আগেই … ইনফরমেশন বোর্ডটা ঠিকমত আপগ্রেড করে নাই, আমি এমনিতেই লেট করে গেটের কাছে আসছি বলে এইসব টের পাই নাই … তাও আমার উচিৎ ছিল গেটের কাছে এসে জিগেস করা, ফেসবুকিং এবং টিপিক্যাল “প্লেন তো আমারে ফালায়ে যাবে না, এত তাড়াহুড়ার কি” এটিচুডের কারণে ধরা খাইতে নিসিলাম …

ব্যাপক ঘটনাবহুল জার্নি :-D”

অশনি সংকেত

আমি একদিন উপলব্ধি করলাম, আমি এমন একটি দেশের নাগরিক যে দেশে প্রতিনিয়ত কোন না কোন সংকট লেগেই থাকে। সেটি হোক প্রাকৃতিক বা নাগরিক সৃষ্ট, প্রতিবেশী সৃষ্ট কিংবা বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের বানানো – ঘটনা যাই হোক না কেন, আমরা বার বার সংকটে ঘুরপাক খাই। একেবারে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ বলা যায়। হয়তো সব দেশই সংকটে ঘুরপাক খায়। অনেক দেশ আছে আমাদের চেয়ে আরো অনেক বেশি সংকটময়। কিন্তু বাংলাদেশটা যে আমার দেশ তাই আমার গায়ে লাগে খুব। আর লাগে অন্তরে। এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, সে খুব সচেতনভাবে বাংলাদেশের সংবাদপত্র এড়িয়ে চলে। ব্যাপারটা আমার ভালও লেগেছিল। সত্যিই তো, পত্রিকা না পড়লে কি হয়। কিছুই হয় না। আমিও বাদ দিলাম। তারপর দুদিন যেতে না যেতেই বুঝলাম, কদিন আগডুম-বাগডুম খাবার খেয়ে পার করলে যেমন ডাল/ঝোল দিয়ে ভাতের একটা খিধে পায় তেমন পত্রিকা না পড়লে তেমন এক অনুভূতি হতে শুরু করে। বুঝলাম আমাকে দিয়ে এই কাজটি সহজে হবে না। আবার একদিন সেই বন্ধু বললো, সে হলো মহা-আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রের ধ্যান-ধারণা বা সীমানা দিয়ে তার জীবন আবদ্ধ নয়। শুনেই কথাটা ব্যাপক অভিনব লেগেছিল – আরে আমার তো এমন কথা কোনদিন মাথায়ই আসেনি, চিন্তা তো অনেক পরের কথা। পরে দেখি সে প্রত্যেক সামার ঠিকই কড়ায়-গণ্ডায় ঢাকায় কাটিয়ে আসে। মনে মনে হাসলাম। ভালই। এমনটাই হয়।

আমাদের দেশটি কিন্তু বেশ অদ্ভুত। দুর্নীতির ধারণা সূচকে যেমন তলানি তেমনি আবার সুখের ধারণা সূচকে দোর্দণ্ডপ্রতাপে প্রথমসারিতে। অবশ্য দুর্নীতির ধারণাসূচক সারাদেশের সব মানুষ দুর্নীতিবাজ তা অর্থ করে না, শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোকে এবং সাথে সম্পৃক্ত মানুষের ক্ষমতার অপব্যবহারকে বুঝায় কিন্তু সুখের ধারণা সূচকে দেশের জনগণের জীবনের পরিতৃপ্তিকে বুঝায়। অবশ্য ওয়েবারিয়ান মডেলে, যে যৌক্তিক রাষ্ট্রের কাঠামোর কথা চিন্তা করা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কাঠামোতে ভাবা হয়, এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে রাষ্ট্রের ও জনগণের যে যৌক্তিক এ্যালাইনমেন্ট এবং সম্পর্ক, তার বিপরীতে যদি মানুষের জীবনকে ডিসকারসিভ ফরম্যাটে দেখা হয় তাহলে কেমন যেন দুর্নীতি বা সুখের সূচকগুলো খেলো হয়ে যায়। মানে আইডিয়ালিস্টিক জীবন আর প্রাত্যহিক জীবন – এই দুইটা যদি পাশাপাশি তুলনা করা হয় তাহলে আইডিয়ালিষ্টিক জীবন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, সংসদ এবং গণতন্ত্র কার্যকর হবে, পুলিশ মানুষের বন্ধু হবে, ব্লাহ ব্লাহ হবে ওয়েবারিয়ান মডেল। আর হাড়িতে ভাত নাই; পেটে ব্যথা; সদু চাচা যে ডালপুরি খায় সেইটার ভিতরে ডালের পরিবর্তে আলু বেশি; সদু চাচারে দেখলে আমি সিগারেট পিছনে লুকাই; রাইতে ঘুম আসে না; ঘরে মশা আর জানালা দিয়ে ঢোকে দুর্গন্ধ; শওকত মেম্বারের বাড়ি গেলে মাঝে মাঝে এক কাপ চা জোটে কিন্তু সেইটা নামেই চা আসলে চিনি আর গরম পানির শরবত; জুতার ভেতর প্রজাপতি, সদু চাচার আবার আমার ছোট বোনের দিকে চোখ লাগায় – এটা হলো ডিসকারসিভ ফরম্যাট। আমাদের আশেপাশে মানে সাউথ এশিয়ায় নাকি ভুটানে দুর্নীতি কম, সুখী মানুষও বেশি। ভুটানে জিএনপি নেই, আছে GNH – গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস। কি মজার‍! তাই না? কিন্তু কথা হলো, সুখ আসলে একটা মিথ। তাইলে? উত্তর জানিনা।

গরীবের বউ সবার ভাবী!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে তখন সবে চাকরি করি। এর মধ্যেই সেটা গত দশকের কথা হয়ে গেলো। লাঞ্চ টাইমে বাইরে খেতে যাই। এলাকার নাম গুলশান। তিন চারজন কলিগ একসাথে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন খাবার দোকানে এক একদিন খেতাম। ঘুরে ফিরে প্রায় সব জায়গায় একই মানুষের সাথে দেখা হয়। কারণ অফিসগুলো নির্দিষ্ট আর খাবার দোকানও আনুপাতিক হারে বাড়ে না। আমাদের অফিসে তেমন কোন ড্রেস কোড ছিলো না। অবশ্য তাই বলে কাউকে কোনদিন লুঙ্গি পরে আসতে দেখিনি। আচ্ছা, আমরা কেন লুঙ্গি পরি না? কেন এই জিনিসটারে জাতীয়ভাবে খ্যাত পোশাক বানানো হলো? আমি নিজেও পরি না, বাসায়ও না। কিন্তু আমার এক আমেরিকান বড়ভাই-কাম-গাইড-কাম-মেনটোর আছে, নাম ডেভিড পিটারসন। ডার্থমাউথ কলেজের লিঙ্গুইস্টিকসের প্রফেসর। সে কিন্তু বাংলাদেশে এসেই লুঙ্গিটারে ঠিকই পিক করে নিয়েছিল। সে আমাকে বলেছিল – রাব্বী, লুঙ্গি হলো পৃথিবীর মোস্ট কমফোর্টেবল মেইল লোয়ার আউটার ওয়্যার। ডেভিড থাকে বোস্টনে, সামারে নাকি সে লুঙ্গি পরে বাসায়। নিয়মিত পরে কিনা জানিনা তবে পরে। বাংলাদেশে আসলে অবশ্যই পরে। যাই হোক, আমার অফিসে একটা ক্যাজুয়াল ব্যাপার ছিলো, অনেকেই ফতুয়া-পাঞ্জাবি-জিন্স পড়তো। মেয়ে এবং ছেলে নির্বিশেষে।

মূলকথা আমাদের পোশাকে তেমন ঠাটবাট ছিল না, বরং স্বাচ্ছন্দ্যের প্রাধান্য ছিলো (কারণ মনে হয় বেতন কম ছিল আর ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি হবার কারণে কর্পোরেট কালচারের চাপ কম ছিল, কিংবা খ্যাত লোকজনের আধিক্য ছিল। হবে কিছু একটা)। কিন্তু অন্য অফিসের যাদের সাথে নিয়মিত দেখা হতো তারা খুব কেতাদুরস্ত ছিল। তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর এবং তার হেয়ার ড্রেসার হাবিব সাহেবের বদৌলতে চুলের জেল জিনিসটা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে ফেলেছে। আশেপাশে অনেককেই দেখতাম সেইরকম ভুমভাম। তাদের নাম দেয়া হয়েছিল ‘ইটে চাঁপা ঘাস’। ফিটফাট, ছেলেদের চুলে জেল, একেবারে ইয়ো; মেয়েদের চুলে নানারকম কাট – নয়তো রঙ,  হাঁটলে টকাস টকাস শব্দ। তো আমরা ঘুরে ঘুরে সেই একই ‘ইটে চাঁপা ঘাস’ দেখি। শুধু ঘাস দেখেছি তা জোর গলায় বলা যাবে না, ঘাসিনী দেখলে যে চোখ বন্ধ করে রাখতাম তা কিন্তু নয় (ঘাসের তো স্ত্রীলিঙ্গ থাকার কথা না, তাইনা।)। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গেল যে সন্ধ্যায় বাসায় না ফিরে কলিগরা মিলে ‘টাইম আউটে’ বসে আড্ডা পেটাই। বাসায় ফিরি নিয়মিত রাত করে। এরকম করতে করতে আমি যখন প্রায় ‘আউট’ হবার পর্যায়ে, তখন আমার কলিগ কাম বন্ধু রুবায়েত আর মিল্টন একদিন জানালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে এবং বিয়ামের পেটের ভিতর একটি স্পেশালাইজড কলেজ হচ্ছে এবং নাম – সিভিল সার্ভিস কলেজ। তাদের প্রথম ইনটেক নিবে। মূলত: ব্যুরোক্র্যাটদের জন্য, আর সামান্য কিছু ছাত্র বাইরে থেকে। যাইহোক, কেমনে কেমনে চামে এডমিশন হয়ে গেলো। সব ডাকসাইটে ফ্যাকাল্টি মেম্বারস। ড. ফখরুদ্দিন আহমদ, ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম, ড. আকবর আলী খান, প্রফেসর মোহাব্বত খান থেকে শুরু করে সব হাই প্রোফাইল লোকজন। নাম বলতেও গলা শুকায় যায় আরকি।
ধুমধাম ওরিয়েন্টেশনের পর শুরু হলো ক্লাস। ক্লাসমেট সব উরাধুরা – হয় ‘উপ’ নাহলে ‘সহকারী’ মানে উপ-সচিব আর সহকারী জজ। সেইরকম ভুমভাম ক্লাস। এদের মধ্যে আমরা তিন নাদান শিশু। শুরু হলো আমার মাস্টারস অব পাবলিক এ্যাডমিনিসট্রেশন ইন গর্ভানেন্স এন্ড পাবলিক পলিসি। একেবারে গালভরা নাম। সপ্তাহে তিন/চারটি কোর্সের ক্লাস। দুটি করে এক একটি কোর্সের ক্লাস, মোট ছয়/আটটি ক্লাস। সারাদিন অফিস, তারপর সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ক্লাস। একদম চিপায় পড়ে গেলাম। ক্লাস যে টপিকে শুরু হোক না কেন – শেষ হয় ডিসি অফিসের মিটিঙের মতো করে। হাইরারকি মেনে ক্লাসে কথা বলে লোকজন। প্রথমে জয়েন্ট সেক্রেটারি, তারপর ডেপুটি সেক্রেটারি, এরপর সিনিয়র এ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি, এবং সবশেষে এ্যাসিসটান্ট সেক্রেটারি। সেক্রেটারি দলের কাছে আবার জজ দল পাত্তা পায় না। আমার জজদের জন্য দুঃখই লাগতো। খালি মোহাব্বত স্যারের ক্লাসে কারো কোন চুদুরবুদুর চলতো না। উনি খ্যাপাতে ধরনের মানুষ, কোন ডিসি-জজ পোঁছেন না। ক্লাসের তাবৎ ডিসি-জজরা আমাদের ভাই হয়ে গেলেন দুই সপ্তাহের মধ্যে। নরসিংদীর এডিসি রেভিনিউ সাহেব(নাম মনে নাই এখন)খাতির করে একদম ভাই-বেরাদার বানিয়ে ফেললেন। কারণ পরে বুঝলাম, নিয়মিত ক্লাসে আসতে পারবেন না তাই ক্লাসনোট এবং চোথা যাতে পান তার ফন্দিফিকির। নরসিংদী যাবার দাওয়াত দিয়ে বসলেন। কিন্তু যাওয়া হয় নাই। তো সেখানে কোর্সের একটি ছিল ‘পোর্ভাটি এলিভিয়েশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’, তার শিক্ষক ছিলেন ড. শাহাদত হোসেন, ডেপুটি সেক্রেটারি, পোস্টিং মহামান্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়। সরাসরি বঙ্গভবন থেকে এসে ক্লাস নেন উনি, এই সাংঘাতিক ঘটনায় নিজেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত মনে করা শুরু করলাম। তো শাহদাত স্যার (শিক্ষক অর্থে স্যার) যাই পড়ান না কেন, হোক সেটি পোর্ভাটি মেজারমেন্ট টেকনিকস, জিডিপি/জিএনপি, জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট, পিআরএসপি, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস, হাংগার এন্ড ফেমিন থেকে শুরু করে নেপচুন, প্লুটো যাই পড়াক, শেষ করতেন ‘গরীবের বউ সবার ভাবী’ বলে। আমরাও কোর্সের নাম পালটে ফেললাম ‘গরীবের বউ সবার ভাবী’। গরীবের ঘরে নাকি সুন্দরী বউ থাকতে নাই। স্যার আসলে কথাটা বাংলাদেশ অর্থে বোঝাতেন। বলতেন, দ্যাখেন না আমেরিকা, ব্রিটেন, চায়না, ইন্ডিয়া, সবাই বাংলাদেশে ফুচকি মারে। কথাটা আমার মনে গেঁথে আছে সেই থেকে।যাইহোক, প্রথম সেমিস্টার শেষ হবার আগেই আমি ড্রপ আউট হয়ে গেলাম সেই মাস্টারস প্রোগাম থেকে। আমি শিক্ষিত হতে পারলাম না, তাই আমার জীবনের গতিপ্রকৃতি পাল্টে গেল ‘গর্ভানেন্স এন্ড পাবলিক পলিসি’ থেকে ‘সেলফ গর্ভানেন্স এন্ড প্রাইভেট পলিসিতে’ মনোনিবেশ করলাম। কাহাতক আর বোরিং ক্লাস করা যায়! যাইহোক, সিলেটের কোন একটি জায়গার বেশ কিছু একর জায়গা নাকি বিএসএফ ভারতীয় চাষি নিয়ে দখল করে নিয়েছে এবং ফেরত দিবে না কারণ সেই মাটির নিচে আছে ইউরেনিয়াম। খবরটি জেনেছি অসমর্থিত সূত্র থেকে। কেউ কিছু জানেন নাকি? সত্যতা আছে?

মাইক্রোফাইনান্সের এখন গ্রহণের কাল
বাংলাদেশের নাম এতদিন যে দুটি বড়ো কারণে পজিটিভ অর্থে ধ্বনিত হয়ে আসছে বা হয় তাদের উত্থান প্রায় সমসাময়িক। মাইক্রোফাইনান্স এবং ক্রিকেট। ক্রিকেটে অনেকের নাম। কিন্তু মাইক্রোফাইনান্সে অনেক মানুষ থাকলেও শুধুই ড. মুহম্মদ ইউনুসের নাম। পক্ষ-বিপক্ষ কোনটাই না নিয়েও জানার জন্য, জ্ঞানের জন্য মাইক্রোফাইনান্স নিয়ে কথা তো বলা যাইতে পারে, নাকি? আমি নিজে ড. ইউনুসের কথা সামনাসামনি শোনার সুযোগ পেয়েছি একবার। ড. ইউনুসকে মনে হয়েছে ক্যারিসম্যাটিক এবং স্মার্ট একজন ব্যক্তি। আমি যদি বলি উনি আমার দেখা গণ্ডিতে বাংলাদেশি মানুষদের মাঝে আন্তর্জাতিক মহলে সবথেকে স্মার্ট, তাহলে আমার সীমিত দেখার মধ্যে সেটি ভুল হবে না বোধহয়। অবশ্য আমি ঠিক সিওর না আইরিন খান ওনার চেয়ে স্মার্ট কিনা। বক্তৃতা দিয়ে বিচার করলে প্রায় সমানেসমান। আর বাঙ্গালি ধরলে, ওনাদের আগে আসবে অমর্ত্য সেন এবং অমিতাভ ঘোষ। পরের দু’জনের ব্যাপারে আমার খানিকটা পক্ষপাতিত্ব আছে। যাইহোক, ড. ইউনুসকে দেখেছি মারকুটে বিদেশী প্রফেসর/ছাত্রদের সামনে একজন অপ্রতিরোধ্য তুখোড় বক্তা হিসাবে, কিন্তু বাংলাদেশিদের সামনে বরং খানিকটা কম সাবলীল। উনি নোবেল শান্তি প্রাইজ পাবার পর আমার এক সহকর্মী মজা করে বলেছিলেন, ড. ইউনুস হাটহাজারীর মানুষ, ওখানে দাদন ব্যবসার খুব চল। উনি শুধু ওল্ড ওয়াইন ইন দ্য নিউ বোটল করেছেন। সো, আইডিয়া কামস ফ্রম দ্য বটম। কথায় যুক্তি ছিল। ফেলা যায়নি। যাইহোক, ওল্ড ওয়াইন নিউ বোটলে ভরে আর ক’জন কামিয়াব হয়। তবে আমার অল্প বোঝায়, ড. ইউনুস যে কাজটি সাফল্যের সাথে করেছেন তাহলো কনভেনশনাল ব্যাংঙ্কিং প্রাকটিসের মাইন্ডসেটসটি ভেঙ্গে দিয়েছেন। পুরা বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়েছেন। যে কোন গরীব মানুষ লোন পেতে পারে এবং সেটি কোন কোল্যাটারাল ছাড়াই(যদিও বিষয়টা তারপরও কিছুটা ট্রিকি, আসলে সবাই লোন পায় থিওর‌্যাটিক্যালি, কিন্তু বাস্তবে না)। ড. ইউনুসের ব্যক্তি মানুষ সম্পর্কে আমি খুব কম জানি তাই ওদিক নিয়ে তেমন কিছু বলার নাই।

মাইক্রোফাইনান্সের এখন গ্রহণের কাল। এর আগে মাইক্রোফাইনান্সকে কখনো দেশে-বিদেশে এতো সমালোচনায় এবং সংকটে পড়তে হয়নি। গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনুস নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচনা নতুন কিছু না, আগে থেকেই আছে। আমি নিজেও মাইক্রোফাইনান্সের বিষয়ে সমালোচকের ভূমিকা নিই সাধারণত। কিন্তু দেখলাম এই সমালোচনার ধরণ প্রকৃতি পাল্টাতে শুরু করে টম হেইনম্যানের ডকুমেন্টারি ‘কট ইন দ্য ডেট’ নরওয়েজিয়ান টেলিভিশনে রিলিজ পাবার পর থেকে যেখানে মাইক্রোফাইনান্সের কারণে যে মানুষ সফল না বরং উল্টোটি হচ্ছে সেটি দেখানো হয় এবং বের করে আনে গ্রামীণ ব্যাংক একসময় ডেভেলপমেন্ট ফান্ড স্থানান্তর করেছিল। ধারণা করা হয়, বড় তহবিলের কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের ট্যাক্স মওকুফ উঠে যেতে পারে সেই শঙ্কায় এটি করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটি চাউর হয় এমনভাবে যে ড. ইউনুস গ্রামীণ থেকে ফান্ড মেরে দিয়েছেন। অবশ্য তার আগে থেকেই ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে কিছু আত্মহত্যার ঘটনায় মাইক্রোফাইনান্স চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আন্তর্জাতিকভাবে। গ্রামীণ ব্যাংকে যদি ফান্ড অব্যবস্হাপনা হয়ে থাকে তার জন্য ড. ইউনুস বা বোর্ড দায়ী হবেন (তদন্ত করলেই বোঝা যাবে), সেই কারণে মাইক্রোফাইনান্স দায়ী নয়। মাইক্রোফাইনান্সের নিজেরই অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। তারপর আছে সোশ্যাল বিজনেস টপিক! তবে এটাও একটা বিবেচ্য বিষয় যে ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ব্যবহারে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন বা স্থানান্তর সব বড় উন্নয়ন সংস্থাতে হয়ে থাকে। এমনকি এটা সরকারেও করা হয়। ব্যাপারটা ন্যয়সংগত কিনা জানিনা, তবে মনে হয় একটা ট্রিকি ফ্যাক্টর। তাই বলে ব্যাপারটা গুরুতর অসংগতি হলে জায়েজ করে নিচ্ছি না। বাস্তবতা বললাম। তবে একটা প্রশ্ন থাকে যে অডিটিংয়ে কি দেখানো হয়েছে এবং গ্রামীণের বোর্ডে যে সরকারের দুজন সদস্য থাকেন তারা কি মতামত দিয়েছিলেন। আবার, খবরে পড়লাম গ্রামীণের ফান্ড নাকি ড. ইউনুসের পারিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসার কারখানায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এটা একদম লেটেস্ট ধাক্কা। গ্রামীণ ব্যাংক অবশ্য বলছে যে ঘটনাগুলো যেভাবে প্রচারিত হচ্ছে বাস্তবতা সেটি ছিল না।

মাইক্রোফাইনান্স দুনিয়াব্যাপি অনেক খ্যাতি কুড়িয়েছে এবং ড. ইউনুস সাফল্যের সাথে মিডিয়াকে ব্যবহার করেছেন। মাইক্রোফাইনান্সকে একটি তেলেসমাতি ব্যাপার হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু সব সমস্যার মুশকিল আছান তো আর মাইক্রোফাইনান্স হতে পারে না। আমি যদি টাকা ধার নিই, ধরলাম মাইক্রোক্রেডিটই নিয়েছি, তাহলে সেটি খাটিয়ে তারপর আয় করে সেই টাকা সপ্তাহে সপ্তাহে ফেরত দেওয়া লাগবে – ব্যাপারটির সাথে বিনিয়োগ, উৎপাদন, বিক্রয়, লাভ, ক্ষতি সবকিছু জড়িত। তার মানে একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা জড়িত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হাঁস-মুরগী চুরি যাওয়া, রোগ-শোক, পঙ্গপালের আক্রমণ কত কিছু হতে পারে। অবশ্য ড. ইউনুসের এক প্রশ্নের উত্তরে শুনেছি যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ‘দুর্যোগ’ ঘোষণা দিয়ে নাকি ব্যাংকের সেই শাখা বন্ধ রাখা হয়, চলতি ক্রেডিট কার্যক্রম – সাপ্তাহিক কিস্তি বন্ধ করে দেয়া হয়। আবার গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা এসব চরানো এক লোকের সাথে একবার পরিচয় হয়েছিল, ঘটনাক্রমে তার নামও, ইউনুস! উনি বলেছিলেন যে কেউ ক্রেডিট নিয়ে চিপায় পড়লে তাকে আবার একটা বড় ক্রেডিট ধরিয়ে দেওয়া হয় রিকাভারির জন্য। তার কথা অনুযায়ী, মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে ১৫-২০ শতাংশের মতো সাধারণত সফল হয়, বড় একটা অংশের মানুষ শুধু সারভাইভ করে আর নাকি ১০-১৫ শতাংশের একটা দল বির্পযস্থ হয়। বিপর্যস্ত মানুষ আরো কিছু বেশি হতে পারে। আমি সেই ইউনুস ভাইকে বলেছিলাম, তাহলে লাভ কি হলো এবং কার হলো? উনি আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন, এই যে এতো বড় গ্রুপ মার্জিন লাইনে সারভাইভ করে মাইক্রোক্রেডিট না থাকলে এরা না খেয়ে মারা পড়তো। আর প্রতিষ্ঠানের লাভ হলো – এটা তার ধারণা। এখন সমস্যা হলো, মাইক্রোফাইনান্সকে যতোটা প্রাতিষ্ঠানিকরন করা হয়েছে, একটি ডিসকোর্স হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার বিপরীতে এর প্রভাব নিয়ে মানে গত ত্রিশ বছরে কার কি পরিবর্তন হলো তার ব্যাপক ভিত্তিক কোন বেজলাইন ডেটা নাই। মানে আমি অন্তত: কোনদিন শুনিনি যে প্রকাশিত হার্ডডাটা আছে। তবে পিকেএসএফ বা বড় এনজিওগুলোর কাছে থাকতে পারে। যাইহোক, মাইক্রোফাইনান্স কোন অলৌকিক জাদুমন্ত্র না।
মাইক্রোফাইনান্সের আন্তর্জাতিক সাফল্যের মূলে ছিল যে এটা দিয়ে দারিদ্র বিমোচন হতে পারে। এটি একটি দারিদ্র বিমোচনের টুল। টাকা ধার নাও, রুজি করো, ধার ফেরত দাও, নিজে পুঁজি করো, স্বাবলম্বী হও – ভালই তো শুনতে। ড. ইউনুসকে এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল, “কোন অবস্থায় গেলে একজনকে মাইক্রোক্রেডিট দেওয়া থামানো হবে”? উত্তরে ড. ইউনুস বললেন, “কখনোই না করা হবে না।শুধু শুরুটা আমাদের ইচ্ছায় আর শেষ হবে ক্রেডিট গ্রহীতার ইচ্ছায়। মাইক্রোসফট বা এ্যাপল এত বড় প্রতিষ্ঠান তারা কি ব্যবসার জন্য প্রয়োজনে লোন নেয় না?” তবে আমার ধারণা, এই পুরো ব্যাপারটা যে ধার নেয় এবং যে ধার দেয় কারো জন্যই সহজ নয়। তবে ধার যে নেয় তার জন্য বেশি কঠিন। উচ্চ সুদের হার এবং সপ্তাহান্তে কিস্তি ফেরত দেয়া মোটেই সহজ না। তারপরও গ্রামীণ ব্যাংক ট্রায়াল এন্ড এরোরের ভিতর দিয়ে গিয়ে মডেল হিসাবে মাইক্রোফাইনান্সকে সফল করে তোলে, মানে মডেলটি চালানোর যোগ্য তা প্রমাণ করে। আজব ব্যাপার, মাইক্রোফাইনান্সের যখন জন্ম, খোদাতালার দুনিয়ায় তখন সোশ্যালিস্ট ব্লকগুলো ভেঙ্গে পড়ছে। বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ তাদের স্টাকচারাল এ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগাম নিয়ে হাজির হয়েছিল। তারা ইনফ্যাক্ট মাইক্রোফাইনান্সের বিরোধিতাও করেছিল। কিন্তু আশির দশক যখন মাইক্রোফাইনা্ন্স সাফল্যের সাথে টিকে গেল। সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো দেখলো, বাহ বেশ তো, বেশ খানিকটা সমবায় ভাব আবার ব্যক্তি এবং স্বাধীন পুঁজির উপর নির্ভরশীল – প্রকল্পটি আবার একটি বেসরকারি উদ্যোগ। সবার জন্য একটা উইন-উইন সিচুয়েশন। আরে এটা তো একটা মোক্ষম টুল। ঠিক এই সময়ে এরকম একটি আর্থসামাজিক এজেন্টের প্রয়োজন ছিল। যে কাজটি হয়তো টম, ডিক এবং হ্যারি যে কেউ করতো সেটিই ড. ইউনুস করেছেন। সময়ের প্রয়োজন – ভুল বা সঠিক সেটি বিষয় না – চলনে-বলনে, আকারে, প্রকরণে মাইক্রোফাইনা্ন্স একটি নিও-লিবারেল এজেন্ট। তাতে কোন সন্দেহ নাই। মাইক্রোফাইনান্সে বড় মাপের যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে তার সবই প্রায় উদারবাদী অর্থ। উদারবাদী অর্থের সারা পৃথিবীতে ধর্ম হলো যে গিলবে একটি সময়ে এসে তার উদরাময় হওয়ানো, হয়তো মাইক্রোফাইনান্সের এখন সেই সময়।

কিছু কিছু দেশে আবার রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচনের আগে এসে তাদের নির্বাচনী এলাকার মানুষদের মাইক্রোফাইনান্সের অর্থ ফেরত দিতে মানা করেছেন। সস্তা জনপ্রিয়তা প্লাস আধিপত্যের রাজনীতি। আমাকে আমার নির্বাচনী প্রতিনিধি যদি এসে বলে যে তোমার আর আজ থেকে ব্যাংকলোন ফেরত দেয়া লাগবে না। আমার জন্য এর চাইতে খুশির ব্যাপার কমই থাকবে। আনন্দে সাড়ে তিনখানা ডিগবাজিও দিয়ে ফেলতে পারি বিছানায়। এটি ঘটেছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে। রাজনৈতিক নেতাদের একটি সমবায়ভিত্তিক ক্রেডিট প্রোগ্রাম চালু ছিল, মার্কেটে মাইক্রোক্রেডিট নতুন প্লেয়ার হিসেবে আসায় একটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি হয়। ওস্তাদের মাইর শেষ দানে – নেতারাও একহাত দেখে নিয়েছেন। তাছাড়া গতবছরে কিছু আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে ভারতে। এই যখন অবস্থা, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার তখন প্রাদেশিক আইন করে মাইক্রোফাইনান্স বন্ধ ঘোষণা করেছে।

আবার বিদেশের কিছু গবেষণাতে পাওয়া গিয়েছে যে মাইক্রোফাইনান্স আসলে দারিদ্র বিমোচনে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারে না – তো এই সাংঘাতিক আঘাতটি এসে পড়লো এমন সময় যখন মাইক্রোফাইনান্স দেশদেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার কিছু গবেষণায় এমন ধারনা পাওয়া গিয়েছে যে মাইক্রোফাইনান্স করে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যের উন্নতি বা লেখাপড়ায় অগ্রগতি – কোনটাই তেমন কোন কাজে লাগে না। মাইক্রোফাইনান্সের আসল ট্রিকটি হলো নারীর সম্মান বা সম্ভ্রমের – আমরা জানি যে মাইক্রোক্রেডিট দেওয়া হয় নারীদেরকে – কোন বস্তুগত কোল্যাটারাল ছাড়াই – কিন্তু লামিয়া করিম দেখিয়েছেন যে নারীর সামাজিক-রাজনৈতিক সম্ভ্রম হলো মাইক্রেডিটের অদৃশ্য সামাজিক কোল্যাটারাল। এই সম্ভ্রম জিনিসটা পুরা প্রক্রিয়াটা চালু রাখতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতে আবার মাইক্রোফাইনান্স ‘নন-প্রফিট’ মেকানিজম থেকে ‘ফর-প্রফিট’ মেকানিজমে রূপান্তরিত হয়েছে। সেখানে নিয়মকানুন আরো কড়া। ড. ভিক্রম আকুলা, যিনি ভারতে বিশাল অর্থের মালিক হয়েছেন মাইক্রোক্রেডিট থেকে – তিনি বলছেন যে মুনাফামূখী লগ্নীকারীর কার থেকে অর্থ নিয়ে মাইক্রোফাইনান্সে বিনিয়োগ করলে সেইটার ফলে তাবৎ দুনিয়ায় মাইক্রোফাইনান্স আরো দ্রুততার সাথে ছড়াবে এবং গরিব মাইনষের উপকার বেশি হবে। দেখেছেন কাণ্ডটা কি?

মাইক্রোফাইনান্স পরিস্থিতির আবার আরেকটা ডাইমেনশন আছে। যেটি আসলে ড. ইউনুসের নির্বুদ্ধিতা ছিল, কিংবা অন্যকিছু। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে এসে তার রাজনৈতিক অভিপ্রায়। যা তার গ্রহণযোগ্যতা আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনে। অনেককে বলতে শুনেছি, এক মিলিটারি সরকারের সময় উত্থান আরেক মিলিটারি সরকারের সময় পতন। ড. ইউনুস ছিলেন প্লান ‘এ’ এবং ড. ফখরুদ্দিন ছিলেন প্লান ‘বি’ – আর খেলারামরা (জি-৮) শুধু খেলে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তো আর মসৃণ না, সুতরাং উত্থান-পতনও থাকবেই। যাইহোক, ড. ইউনুসের উপরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা খুব নাখোশ। পুরানো পাগলে ভাত পায়না, আবার নতুন পাগলের আমদানি! বামরা আগে থেকেই তার কর্মকাণ্ডে নাখোশ ছিলেন, এবার ডানরা যুক্ত হলেন। তৃতীয় শক্তির মতামত জানতে পারলে হতো। তৃতীয় পার্টির অবশ্য নিজের জোর নাই, তারা সবসময়েই কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়ে এসেছেন। দেখতে অন্যরকম লাগে শুধু। যাইহোক, ক্ষমতাসীন সরকার ড. ইউনুসের উপর নাখোশ। কারণ উনি ২০০৭ সালে রাজনৈতিক দল করতে চেয়েছিলেন। আবার এমন কথাও চালু আছে, যে বিএনপি যেহেতু তাঁকে পছন্দ করে তাই আওয়ামীলীগ তার উপরে রেগে আছে – এটা বাংলাদেশের গত দুই দশকের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রবঞ্চনা, তার সাথে সত্য-মিথ্যা, কার্যকারণ কোন কিছুর সম্পর্ক না থাকলেও চলে। তারপরের যে কথাটি চালু সেটি অবশ্য আরো এককাঠি সরেস, আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও নাকি একখানা শান্তি লুবেল পাবার বহুদিনের খায়েস। গত টেনিউরেই নাকি চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সফল হয়নি। গরীবের রক্ত চুষে যদি কেউ লুবেল পায় তাহলে গরীবের জন্য হাজতখেটে কেন তা পাওয়া যাবে না? কথায় কিন্তু যুক্তি আছে! সত্যমিথ্যা জানিনা, স্তুতিকারীরা যে এমন পর্যায়ে নিতে পারে তাতে আর সন্দেহ কি! তবে, পুরষ্কার-খ্যাতি এগুলো পেতে কার না ভাল লাগে, আমার অন্তত লাগে, যদিও পাই না। কারো কারো তো বেশি ভাল লাগে – একথা আমরা সবাই জানি। এখন ড. ইউনুসকে যদি আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা যায় তাতে নাকি দেশে আরেকটি লুবেলের সম্ভাবনা বাড়ে। এটা এখন একটি পলিটিকাল ক্যাম্পেইন। ঠিকই তো আমেরিকার এতো এতো প্রেসিডেন্ট-ভাইস প্রেসিডেন্ট লুবেল পায়। এতো দূর যাই কেন – পাশের দেশ বার্মায় অং সাং সুকি গৃহবন্দী থেকেই লুবেল পেলেন। আর আমাদের নেত্রী আর বিরোধী নেত্রীরা একটা বছর জেলের ঘানি টানলেন তারা কি কিছুই পাবেন না? এইডা কি ইনসাফ হইলো?!

তাহলে মাইক্রোফাইনান্সের ভবিষ্যৎ কি?
মাইক্রোফাইনান্সের একটি গ্ল্যামারস পরিচিতি এবং ব্যাপ্তি তৈরি হয়েছিলো। এই ধাক্কায় সেটি হয়তো আঘাতপ্রাপ্ত হবে। অনেকেই মনে করেন, মাইক্রোফাইনান্স দেশে যতো কঠিন সময় পার করছে, তার চেয়ে বেশি করছে বিদেশে। বিশেষভাবে, ভারতে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো নিয়ে। মাইক্রোফাইনান্সের জন্য নিয়মনীতি কড়াকড়ি হবে নিশ্চিতভাবে। অনেকেই এটি থেকে আস্থা ফিরিয়ে নেবেন তাতে সন্দেহ নাই। দাতারা বুদ্ধিমান, তাদের কাছে কে ইউনুস আর কে পাটোয়ারি সেটি বড় বিষয় নয় – নতুন ফান্ডিং কৌশল চাই। পৃথিবীতে গরীব মানুষ নিয়ে কারবার থেমে থাকবে না, হয়তো কৌশল পাল্টে যাবে – হয়তো মাইক্রোফাইনান্সের জায়গায় ন্যানোফাইনান্স চলে আসবে। তখন ঘরে বসে গরিব মানুষের ক্রেডিট কার্ড দিয়েই কাজ হয়ে যাবে। গ্লোবাল ফা্ন্ডিং গতদশকে এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকায় চলে যেতে শুরু করেছে, মাইক্রোফাইনান্সও তার পিছু ধরেছিল। সেটি ব্যাহত হতে পারে। তবে, তারপরও মাইক্রোফাইনান্স হয়তো টিকে যাবে। সামলে নেবে। মাইক্রোফাইনান্স এবং তার পরিচালনাকারী বড় প্রতিষ্ঠানসমূহের সোশ্যাল ক্যাপিটাল অনেক শক্তিশালী। তাই হেই বললেই নেই করা হয়তো সম্ভব না। তবে আগের মতো জৌলুস আর হয়তোবা নাও থাকতে পারে ভবিষ্যতে।

***

কি লিখতে কি লিখলাম। তবে অনেক লিখে ফেললাম। আচ্ছা, এমনটাই থাক। আলসেমিতে আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। কাল ভাবছিলাম বাংলাদেশ এখন কি কি নিয়ে সরগরম – পেলাম চারটি বিষয়। তিনটি হতাশাজনক এবং দুঃখের। আর একটি আনন্দের। হতাশার কথা বলি প্রথমে – বাংলাদেশ-ভারত বর্ডার ইস্যু, শেয়ার বাজারে ধ্বস এবং মাইক্রোফাইনান্সের গ্রহণের কাল। আর আনন্দের বিষয়টি হলো ক্রিকেট ওর্য়াল্ডকাপ সামনে. দেশের মাটিতে, বাংলাদেশ হোস্ট কান্ট্রি। সুখ-দুঃখ আমাদের জীবনে ফিরে ফিরে আসবে। শুধু ভুলে যাবো তারকাটায় ঝুলে থাকা ফেলানি’র লাশ।

এই দিনে সেই দিন

আশির দশকে আমরা তখন খুলনায় থামতাম। খুলনা আমার শৈশব এবং কৈশোরের শহর। পৃথিবীর আর কোন শহর এতো বেশি নিজের মনে হয়না। শান্ত এবং স্নিগ্ধ একটি শহর। আমার প্রথম স্কুল সেন্ট জোসেফস, বাসা থেকে হাঁটা দূরত্বে ছিল। আমাদের বাসাটি ছিল ৩৬ আহসান আহমেদ রোড। সেই রাস্তার এক মাথায় ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আরেক মাথায় ছিল প্রাইমারি টেনিং ইন্সটিটিউট। আর পুরো রাস্তা জুড়ে যেন আমার রাজত্ব ছিল। বরষায় যখন পিটিআইয়ের মোড়ে রাস্তা পানিতে থৈ থৈ কর‌তো, তখন যে আমার কি সাংঘাতিক আনন্দ হতো। সেন্ট জোসেফস স্কুলটাও ডুবে যেতো। তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যেতো। গ্যাব্রিয়েল মল্লিক স্যার নিজে দাড়িয়ে থেকে দেখতেন বাচ্চারা ঠিকমতো বাসায় ফিরতে পারছে কিনা। সেদিন রিক্সায় করে বাসায় ফিরতাম। দুইটাকা ছিল রিক্সা ভাড়া। রাস্তা ডুবে গেলে ভাড়া দুই টাকা, এমনিতে এক টাকা। রিক্সার চাকার স্পোকে পানি ছিটকে যাচ্ছে দেখে খুব আনন্দ হতো। আহসান আহমেদ রোডে বেশ কিছু ব্রিটিশ আমলের বাড়ীঘর ছিল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়ীগুলো সত্যি সত্যি দেখার মতো ছিল। সেই কারণে কিনা জানিনা, এখনো পুরানো বাড়ি দেখলে আপ্লুত হয়ে পড়ি। আমরা একটি পুরোনো একতলা বাড়িতে থাকতাম। দেড়-দুই বিঘা হবে পুরো কমপাউন্ডটা। বাসাটি ছিল সবুজে ঘেরা। অনেক গাছপালা ছিল।
সুন্দর একটি ফুলের বাগান ছিল ঠিক ঘরের সামনে। বাসার সামনেটা আলিঙ্গন করে দাড়িয়ে ছিল একটি বোগেনভেলিয়া গাছ। তার পাশ একটি বড় বাতাবি লেবু গাছ। সেই গাছের বাতাবি লেবু ছিল আমার প্রথম ফুটবল। আমার মায়ের খুব বাগান করার শখ। কামিনী, হাসনাহেনা, বেঁলি, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জবা, ডালিয়া, কত রকমের যে ফুলের গাছ ছিল! প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা রাত জেগে সেই বাগান পাহারা দিতাম। টান টান উত্তেজনা থাকতো। কারণ যারা না বলে ফুল নিতে আসতো, তারা ফুল ছিঁড়ে গাছটা উপড়ে রেখে যেতো। আমরা বাসার কাছেই একটি মন্দির ছিল। সেই মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি হিন্দু লোকালয় ছিল বা সেই লোকালয়কে কেন্দ্র করে মন্দিরটি ছিল। হিন্দু লোকালয় বললাম কারণ পুরানো এলাকা। একটি অদৃশ্য দেয়াল দেয়া ছিল হিন্দু বসতির জায়গাটুকুতে। তার চারপাশ ঘিরে মুসলমান পরিবারগুলো থাকতো। একটি ঘাট বাধানো পুরোনো পুকুর ছিল। সেখানে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই গোসল করতো। আমি সেখানে সাঁতার শিখি। তবে হিন্দু-মুসলমান কোন অস্পৃশ্যতা বড়দাগে ছিল না। নাড়ের গোষ্ঠির লোকজন নিজেদের মধ্যে সেটিকে মালায়ন পাড়া বলতো। আমার অবশ্য সেখানে অবাধ যাতায়াত ছিল। সেখানে শৈশবে অশোক নামে একটি বন্ধু ছিল। সে অবশ্য এখন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরা কেউ কেউ খুব ভোরে ফুল কুড়াতে আসতেন আমাদের বাসায়। সাধারণত আমার ঘুম থেকে ওঠার আগেই। কিন্তু তারা ফুল তুলতেন পরিমিত পরিমানে এবং কেউ গাছ নষ্ট করতেন না। আমাদের বাসার কাছে একটি দোতলা মসজিদ ছিল। সেখানে মাঝে মাঝে রাতে তারাবি পড়তে যাবার অনুমতি পেতাম। সেই মসজিদে তারাবির সময় সমবয়সীরা লুকোচুরি খেলতাম সেটাই আমার মূল আকর্ষন ছিল। সেন্ট জোসেফস স্কুলের প্রাচীর লাগোয়া একটি ক্যাথলিক চার্চ ছিল। মন্দির, মসজিদ এবং চার্চ তিনটিই এক কিলোমিটার রেডিয়াসের ভিতর ছিল। কি চমতকার সহাবস্থান  ছিল। কিংবা ছিল না। হয়তো ছোট বলেই মনে হতো সব শান্তিপূর্ন। তবে বাবড়ি মসজিদ ইস্যুর আগ পযর্ন্ত কোনদিন বড়দাগে কোন কিছু দেখেছি মনে পড়ছে না। তবে তারপর যারা সমর্থবান হিন্দু পরিবার তাদের কেউ কেউ কোলকাতার দিকে চলে গেলেন। একদিন আবিষ্কার করলাম প্রাইম ভিডিওর কর্মচারি আমাদের প্রদীপদা রাতের আধারে হারিয়ে গেছেন। আমার বাবার বেশকিছু অগ্রজ এবং অনুজ সহকর্মী চলে গিয়েছিলেন ওপার বাংলায়। তাঁরা চিঠি লিখতেন যে তাঁরা ওখানেও ভাল নেই। মানাতে পারছেন না। সেসব চিঠির কথা আমি না বুঝেই শুনতাম। আব্বাও বলতেন।
চার্চটি আমার খুব প্রিয় জায়গা ছিল। সবুজের মাঝে সাদা চার্চ। সবুজ, সতেজ এবং স্নিগ্ধ একটি জায়গা। চার্চ থেকে যখন ঢং ঢং ঘন্টা বাজতো আমি আযানের মতোই খেয়াল করে শুনতাম। একজন স্নেহপ্রবণ ইটালিয়ান ফাদার ছিলেন। তার ব্যাগে থাকতো পেন্সিল, স্ট্যাম্প এবং লাটিম। আমি তাকে দেখলেই বলতাম, গিভ মি এনাদার ওয়ান। মানে না বুঝেই বলতাম। তবে তাতে কাজ হতো। সম্ভবত কোন একটি দুধের টিভি কমার্শিয়ালে এই কথাটি ছিল। দুধ খেয়ে খালি গ্লাসটি থাশ করে টেবিলের উপর রেখে একটি ছেলে ওই কথাটি বলতো। ফাদার কোনদিন ইটালিয়ান লাটিম, কোনদিন স্ট্যাম্প বা কোনদিন পেন্সিল-ইরেজার দিতেন। সেগুলো পেয়ে কি অকৃত্তিম আনন্দ হতো! রবিবারদিন সকালে ক্লাস থেকে শুনতাম চার্চের প্রেয়ার সং। সবাই একসাথে গাইতো। সেই গানে আমার শৈশবের স্কুল বেলা ভরে উঠতো। যখন গান শুরু হতো আমাদের ক্লাসটিচার মেরি ম্যাডাম কেমন উদাসী হয়ে যেতেন। অনেক সময় পড়া থামিয়ে দিতেন। সন্ধায় আযানের পর বাসা থেকে শুনতে পেতাম মন্দিরের কীর্তন। আহসান আহমেদ রোডে আমার শৈশবের বছরগুলোতে নিয়মকরে বছরে একবার কাওয়ালি হতো। রাস্তা বন্ধ করে প্যান্ডেল টানিয়ে। বিরিয়ানি খাবার থাকতো। সেটা নিয়ে খুব শোরগোল হতো। তবে লোকজনের উদ্দীপনাও দেখার মতো ছিল। সেটির আয়োজক ছিলেন সম্ভবত আমাদের পাড়ার বাকের ভাই এবং বদি খ্যাত নান্টু ভাই এবং ময়না ভাই। কাউয়ালি উপলক্ষে আমাদের বাসার নারকেল গাছটা খালি হয়ে যেতো। নান্টু ভাই এসে আগেই অনুমতি নিয়ে নিতেন পোলাপান দুএকটি ডাব খেতে চায়। না বলার কোন প্রশ্ন বা সুযোগ কোনটাই ছিলনা। নান্টু ভাই আমাদের মহল্লার মানসম্মান ইস্যুতে জীবনপাত করে দিতেন। তার ভাই ছিলেন আর্মিতে কমিশনড অফিসার, সেটি ছিল তার আরেকটি মনের জোর। স্বীকার করতেই হবে আমাকে স্নেহ করতেন। চকলেট কিনে দিতেন। কখনোবা সাতক্ষীরা ঘোষ ডেয়ারিতে নিয়ে গিয়ে ছানার জিলাপি খাওয়াতেন।
ঈদের দিনটি ৩৬ আহসান আহমেদ রোডের মতো এতো আনন্দের কোনদিন কোথাও মনে হয়নি জীবনে। ঈদ ছিল আমাদের সবার একসাথে হবার উপলক্ষ। আমার মা চাকুরি করতেন। শুধু চাকুরি করতেন না, তার কাজের প্রতি যে নির্মোহ ভালবাসা ছিল তার সিকি ভাগও যদি আমার ভেতর থাকতো। আমি আজ অন্য কেউ হতাম। আমার বাবা তার আইনি পেশার কারণে থাকতেন যশোরে। আমার বড় ভাই ততোদিনে ক্যাডেট কলেজ শেষ করে আর্মিতে। তাই ঈদে আমরা সবাই একসাথে হতাম। উৎসবটি ছিল পরিবারের একান্নবর্তী হবার। আগে ঈদে কি এতো এতো কেনাকাটা ছিল? মনে পড়ছে না। অবশ্যই ছিল, কিন্তু এমন কিনতে কিনতে হাবাতে হয়ে যাবার মতো ব্যাপার ছিল না। ঈদ মানে ছিল জানালা দরজার পর্দা পালটে  যাওয়া, কুশন কাভার বদলে যাওয়া, বিছানার চাদর পাল্টানো। তার মানে এই না, সব নতুন। ঈদের চাঁদ দেখাও একটা বিশেষ ব্যাপার ছিল। চাঁদ দেখতে পারি আর না পারি, চকলেট বোমা এবং তারা বাজি নামের এক প্রকার বাজি নিয়ে আমাদের দারোয়ানের ছেলে মাসুদ এবং আলমের সাথে ছাদে অপেক্ষা করে থাকতাম কখন সেগুলোর স্বদব্যবহার করতে পারবো। ঈদের রান্না আম্মা নিজ হাতে করতেন। রান্নাঘরে সাংঘাতিক ব্যস্ত থাকতেন। আব্বাকে দেখতাম নির্ভার, হাসিখুশি, ভাবলেশহীনভাবে দেশ পত্রিকা পড়ছেন, কিংবা কোন বই পড়ছেন কিংবা টিভি দেখতেন। ঈদ এমনই একটি দিন যাকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহ কোন পড়াশুনা থাকতো না। সেসময়ে স্কুল থেকে কোন হোম ওয়ার্ক দিয়ে রাখলেও আমি কোনদিন করিনি। তা নিয়ে আমার কোন অনুশোচনাও ছিল না।
আমার বড় ভাই পিকো তার লাল রঙের ইয়ামাহ মোটর সাইকেলটি নিয়ে ঈদের ছুটিতে আসতো। আমার মনে হতো আমাদের বাসায় কেউ স্পুটনিক পত্রিকায় দেখা স্পেস শাটল নিয়ে এসেছে। যতোক্ষন সুযোগ থাকতো, সাইকেলটি দাড়ানো অবস্থায় তার উপর বসে বড় হবার খেলা করতাম। আমার বড় ভাইয়ের সাথে আমার বয়সের প্রার্থক্য বেশ অনেক। তাই সেসময়ে ছুটিতে এসে সে যখন বিছানায় উপুড় হয়ে থাকতো তার পিঠে উঠে রাতে বাইক চালানোর প্রাকটিসও করতাম নিঃসঙ্কোচে। আমরা চার ভাইবোন আর আব্বা-আম্মা। আহ! কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো। সকালে বড় মাঠ নামে একটা জায়গায় নামাজ পড়তে যাওয়া হতো। সেটি ছিল খুলনা সার্কিট হাউস ময়দান। সেখানেই ঈদের নামাজ হতো। মাঠটি বেশ বড়। সেই মাঠের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ জায়গা ভরে যেতো মানুষে। আমি তখন বিশিষ্ট নামাজী ছিলাম। আব্বার সাথেসাথেই রেডি হয়ে থাকতাম। আমার বড় ভাই আর মেজো ভাই গাঁইগুই করতো। তারপর পুরো কন্টিজেন্টকে দেরি করিয়ে তারাও আসতো। নামাজের পাটি, চাদর সবকিছু আগে থেকেই রেডি থাকতো। আমি ধরতাম সেগুলো। তারপর রিকসায় করে আমরা বড়মাঠে যেতাম। আমরা সাধারনত পাঁচ-ছয় লাইন পরে জায়গা পেতাম। যথাসময়ে নামাজ শুরু হতো। নামাজে সবাই কমবেশি ভুল করতো, এটা চোখে পড়তো। আমি যারপরনাই তাল মেলানোর চেষ্টা করতাম। আব্বাকে ফলো করতাম। নামাজ ঠিকমতোই শুরু হতো, কিন্তু প্যাথেটিক পর্ব ছিল খুঁতবা। ভিনদেশি ভাষায় কি বলে না বলে কিছুই বোঝার উপায় ছিল না। তবে সবচেয়ে আকর্ষনীয় অংশটি ছিল মোনাজাত। সাধারনত বাংলায় হতো। সেই বক্তব্য কিছু কিছু ধরতে পারতাম। ইমামসাহেব যখন সবাইকে পাপী ইনসান বানিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন, মাফ চাইতেন বারবার, আমি তখন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তাম।
আমি আসলে কোনকালেই সুরাটুরা খুব একটা পারতাম না। আমি জীবনে প্রথমবার স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনীতে যে বিষয়ে ফেল করি তা ছিল আরবি শিক্ষা। তারপর বার্ষিক পরীক্ষায় সেই আরবি শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট ট্যুইশনি পড়ে বিরানব্বই পেয়ে পরিবারের সম্মান রক্ষা করি এবং নিজের পিঠ বাঁচাই। আমার আরবি শিক্ষার হাতে খড়ি একজন মহিলার কাছে। আমার বড় দুই ভাই হুজুরের কাছে আরবি পড়েছিল। তাদের সাথে হুজুর যে বেত এবং কিতাবের ভারসম্য রক্ষা করে একটি মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেটি দেখে আমার মা আমার বোনের সময় এসে এডুকেশন পলিসি চেঞ্জ করেন। ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে একজন হুজুরাইনের আগমন ঘটে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমি সেই হুজুরাইন পাই। তিনি বলেছিলেন, আমরা যেন তাকে ম্যাডাম বলে ডাকি। আমরা তাই ডাকতাম। ম্যাডাম বোরকা পরতেন কিন্তু বেশ আধুনিকা ছিলেন। আরবি পড়ার অগ্রগতি নিয়ে কোন জোর জবরদস্তি করতেন না। তাই আমি অনাদিকাল ধরে শুধু কায়দা এবং আমপারা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ম্যাডামের মেয়ে থাকতেন আমেরিকায়। তাই তার চোখে নিউইয়র্কের স্বপ্ন বুদ হয়ে থাকতো। তিনি সৌদিআরবের মহিমার গল্প কোনদিন আমাদের বলেননি। তার মুখেই আমি প্রথম জানতে পারি মহাবিশ্বে নিউইয়র্ক নামে একটি নগরী আছে। যেখানে কোনদিন ইলেকট্রিসিটি যায় না। বিশাল সব অট্টালিকা, সব এলাহি কান্ডকারখানা! কিন্তু নিউইয়র্কে বহু জাতির মধ্যে পর্দানশীন মুসলীম উম্মাও স্বদম্ভে স্থান করে নিয়েছে। সেসময় খুব সম্ভবত টেলিভিশনে “এই সব দিনরাত্রি” নামে একটি ধারাবাহিক নাটক চলতো। যখন সেই নাটক চলতো তার কিছুক্ষন আগে দিয়ে ইলেকট্রিসিটি চলে যেতো। ম্যাডাম আমাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে দরুদ পড়ে পড়ে ইলেকট্রিসিটি ফিরিয়ে আনতে হয়। আমি পঞ্চাশ, পচাত্তর বা একশো দরুদ ধরতাম ইলেকট্রিসিটি ফিরিয়ে আনার জন্য। সত্যি সত্যি নাটক শুরুর আগে বা একটু পরেই ইলেকট্রিসিটি চলে আসতো। আমি বিষ্ময়ে শিহরনে কাঁপতাম যে আমার এমন ক্ষমতা আছে যা আর কারো নেই। নাটক শেষ হবার পর সেগুলো পড়ে বকেয়া আদায় করে ফেলতাম। সেই ক্ষমতা আমি কাজে লাগানোর চেষ্টা করতাম দি ‘এ’ টিম, ম্যাকগাইভার, স্ট্রীট হকস  বা ম্যানিম্যাল দেখার সময় ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে। ম্যাডাম শুধু বাইরেই বোরকা পরতেন, আমাদের বাসায় পরতেন না। তাকে একবার অনেক ধরাধরীর পর তিনি ধর্মসভা নামে একটা জায়গাতে আমাকে পুজা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শর্ত ছিল যে শুধু আমিই যাবো, উনি বাইরে থাকবেন। কিন্তু উনি বোরকা পরে নিমরাজি অবস্থায় শেষ পযর্ন্ত পুজামন্ডপেও গিয়েছিলেন।
সুরাটুরা পারতাম না, এই পটভূমি দিলাম এই কারণে যে ঈদের নামাজের সময় আমার যেহেতু বিড়বিড় করে অভিনয় করা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না। তাই লোকজন দেখতাম মনযোগ দিয়ে। নামাজ শেষে আব্বা সিনিয়রিটি অর্ডার অনুযায়ী প্রথমে আমার বড়ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করতেন, সব শেষে আমি। নামাজ শেষে আব্বা বেশ কিছু পরিচিত লোকজনের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এ্যাডভোকেট দেলদার আহমেদ। সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বোধহয় পাকিস্থান আমলে কেউ একজন ছিলেন। আমার এখন মনে নেই। আব্বার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজ এ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলী এসে কথা বলতেন। তার মেয়ে জনা রাজ্জাক আমার এক ভাইয়ের সহপাঠি ছিল। সেসময় তার ভেতর চাঞ্চল্য দেখা যেতো। আব্বার আরো দুএকজন বয়স্ক এবং ভারি ভারি চেহারার লোকজনের সাথে আলাপসালাপ শেষ হলে আমরা হেঁটে বাসায় ফিরতাম।
আমার মায়ের অফিসের আয়া ছিলেন ফ্লোরা পালমা। তিনি খ্রীষ্টধরমাবলম্বী হওয়ায় ঈদে মোটামোটি দুইদিন তিনি আমাদের বাসায় থাকতেন। আম্মাকে রান্নাবান্নায় সাহায্য করতেন। তার ছেলে রড্ডিক’দা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। আমি তাকে বিশাল খাতির করতাম। তার সাথে আমার ডিল ছিল একটি গুলতি বানিয়ে দেবার। সম্ভবত আম্মা নিষেধ করেছিলেন তাই আর তিনি আমাকে গুলতি বানিয়ে দেননি। সেই ফ্লোরা মাসি কিভাবে ঈদে আমাদের সাথে মিশে যেতেন এখন খুব অবাক লাগে। একটু বড় হবার পর বাসায় খাওয়াদাওয়া পর্ব শেষ করে নিয়মমতো যেতাম এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম চাচার বাসায় শামসুর রাহমান রোডে। ওনার ছেলে জামি এবং তার ভাগনে-ভাতিজা জয় এবং রনি, এরা সবাই এক বাসাতে থাকতো। আমার ছেলেবেলার বন্ধুরা। ওদের পাশের বাড়িতে থাকতো সজল। কি সাংঘাতিক আনন্দের ঈদ করতাম আমরা! জয়ের মুখে আমি প্রথম টলষ্টয়ের গল্প শুনি। কি কাব্যিক বর্ননা ছিল জয়ের। জয়ের সাহিত্যিক হবার কথা ছিল। হয়েছে ব্যাংকার, তবে পড়াশুনা করেছে সাহিত্যে। রনি হয়েছে সাংবাদিক এবং স্কুল শিক্ষক। সজলের সাথে ধর্ম নিয়ে আলাপসালাপ হতো একটু আধটু। সজল বুয়েট পাশ করা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকায় নিজের ফার্ম আছে। এখন এসব নিয়ে ভাবে কিনা জানা নেই। জামির জীবনে মর্মান্তিক বিপর্যয় হয়। মঞ্জুরুল ইমাম চাচা খুন হবার কিছুদিন পর এক সড়ক দূর্ঘটনায় স্মৃতি বিভ্রম হয় জামির। অনেকদিন পিজি হাসপাতালে ছিল। বহুদিন খোঁজ জানিনা ওর। কারো সাথে মিশতো না। আমি কি স্বার্থপর, নিজের জীবন নিয়েই মেতে আছি!
আম্মার সাথে কথা বলি ফোনে। খুব বেশি নতুন বিষয় থাকে না। একই কথা আসে ঘুরে ফিরে। ঠিকমতো খাই কিনা, নিজের যত্ন নিই কিনা। ফাস্টফুড যেন না খাই। আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। এইসব। মাঝে মাঝে নতুন প্রসঙ্গ আসে কখনো কখনো। বাসার কাজের মেয়ে মিনা পালিয়ে বিয়ে করেছে একটি ছেলেকে। পাত্র হাবিব, এমএম কলেজ থেকে মাস্টার্স করা। থাকার জায়গা ছিল না, তাই হাবিব আমাদের বাসায় থাকতো। বিয়ের ব্যাপারটি সত্যি কিন্তু পাত্রপাত্রী স্বীকার করেনি এখনো। আমার মার টেনশন মিনা এখন চলে গিয়ে আলাদা বাসা করবে হাবিবের সাথে। আম্মার সাথে গৃহ প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে পলিসি আলোচনা করি, মিনা এবং হাবিব দুইজনই গ্রামের। মেয়েটার একটা এমএ পাশ ছেলের সাথে প্রেম করে বিয়ে হলো, ব্যাপারটা কত চমতকার হলো। আমাদের কর্তব্য ওরা চলে যেতে চাইলে কিছু দিয়ে থুয়ে নতুন সংসারে সাহায্য করা এবং চলে যেতে উৎসাহিত করা। মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত হই, এতো দূর থেকে ফোন করে এসব নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে না। কিন্তু বুঝি এগুলোই আম্মার প্রায়োরিটি টপিক। তখন শুধু হুঁহুঁ করি অন্যমনস্কভাবে। সেদিনও এসব কথাই বলছিলাম। আম্মা বললো, বাসায় কুরআন খতম এবং মিলাদ পড়ানো হয়েছে। অন্যমনস্কভাবে বলি, খুব ভাল হয়েছে। তারপর – মিলাদের পর ওহী আর রাজ বনানী কবরস্থানে গিয়ে পিকোর কবর জিয়ারত করে এলো। এতিম খাওয়ানো হয়েছে। আমি কিছু না বলে, হুঁ হুঁ করি। আম্মা এবছর একা ঈদ করছে। যশোরে। আমার নানী আমার মায়ের উপর নির্ভরশীল, সে ঢাকায় এসে থাকতে পারে না। আম্মাকেই তাই যেতে হয়। আমি হিসাব মিলাতে চেষ্টা করি স্নেহ-ভালবাসা এগুলো আসলে কি উর্দ্ধমূখী নাকি নিন্মগামী? ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। তবে, এটুকু বুঝি ঈদ আসলে ছোট বেলায়ই সবথেকে আনন্দময় হয়। বড় বেলায় বুঝে গেছি এই আনন্দের ভিতরে কী আছে। সেই শৈশবের ঈদে আমার আর কোনদিন ফেরা হবে না। তা না হয় না হোক, আমি ঈদের প্রথম শুভেচ্ছা পেয়েছি অগ্রজ, বন্ধু এবং সহকর্মী বান্দরবানের গ্যাব্রিয়েল ত্রিপুরার কাছ থেকে। গ্যাব্রিয়েলদা বলেছেন, ঈদ হলো একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস এবং ভালবাসার বন্ধন শক্ত করার একটি চমৎকার সুযোগ যেখানে মানুষ পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে শান্তিময় জীবনের স্বপ্ন দেখতে পারে। প্রত্যাশা রইলো সবার ঈদ প্রিয়জনদের সাথে আনন্দে কাটুক। … আমি অবশ্য ঈদ বলতে পুরোটাই খানাপিনা আর আড্ডা বুঝি।
আজ ঈদ, আজ মদিনার ঘরে ঘরে আনন্দ।

শিরোনামহীন কথোপকথন – চার


- হ্যালো, মোনালির বাবা?
- হ্যাঁ, পিংকী আছো কেমন?
- ভাল। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? গলাটা কেমন ধরা শোনাচ্ছে …
- না, মানে, ওই যে তোমার বুক শেলফটায় মিড নাইটস চিলড্রেন বইটা ছিল না? ওটা পড়তে পড়তে চোখটা বুঁজে এসেছিল।
- সবই বয়সের ছাপ। তোমাকে আগে কোনদিন দেখিনি তুমি বই পড়ার সময় ঘুমিয়ে পড়তে!
- তোমরা আছো কেমন সবাই? অরিত্র আর নির্ভানার কি খবর?
- আমরা আছি ভালো। মোনালি আর জাভেদ তো এখন অফিসে। অরিত্র স্কুলে গিয়েছে। নির্ভানাকে ঘুম পাড়িয়ে তোমাকে ফোন দিলাম। দিপালি কেমন আছে?
- আছে ভাল। দিপালি গতকাল ওর ফেইসবুকে দেখালো নির্ভানার জন্মদিনের ছবি। অরিত্র বেশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ছয় বছর হিসেবে গ্রোথ বেশ ভাল মাশাল্লাহ।
- তোমার নাতি হচ্ছে বদের হাড্ডি। বোনটাকে মেরে মেরে তক্তা বানায়। অরিত্রকে দেখলে নির্ভানা আমার কোলে শক্ত হয়ে বসে থাকে।
- ছোট মানুষ বোঝে না। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের ভার্জিনিয়াতে বেড়াতে যাবার ছবিও দেখলাম। তোমাকে খুব ফ্রেস আর ইয়াং দেখাচ্ছে।
- কি যে বলো না? বয়স এখন ষাট। এখন আবার ইয়াং দেখায় কিভাবে?
- তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আমাদের ইন্দ্রা রোডের বাসায় তুমি যেমন ছিলে।
- বয়স বিশ বছর কমিয়ে দেবার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি যে সেদিন বললে রাতে রাতে গা টা একটু গরম হয়। একটু ডাক্তারের কাছে যাও না। অনেকদিন তো চেকআপ করাও না। হার্টটা আবার একবার চেকআপ করানো দরকার। আমি দিপালিকে বলে দেই ড. বরেণের ওখানে একটা এপোয়েন্টমেন্ট করে দিক। আর খাওয়া দা‌ওয়া করছো তো ঠিক মতো? আমি নেই কি হচ্ছে কে জানে।
- না মানে, এই বয়সে এখনো ঠিক মতো চলতে ফিরতে পারছি এটাই তো অনেক। তুমি তো ফিরতে আর একমাস বাকি। এসো আগে ঢাকায়, তারপর ডাক্তার কবিরাজের চিন্তা করবো। এখন ভাল আছি।
- শোনো, তাহলে আমরা ইন্ডিয়াতে ড. শেঠির কাছেই যাবো। মাউন্ট এলিজাভেদে অত্যাধিক খরচ, এবার আর যাবো না। শেঠিকে দেখিয়ে তারপর নৈনিতাল ঘুরে আসবো। তোমার মনে আছে? আমাদের বিয়ের তৃতীয় বছরে, তখনো মোনালি হয়নি, তুমি আমাকে নৈনিতাল নিয়ে গিয়েছিলে। কি দারুন সুন্দর! আমি কিন্তু তোমাকে তখন পরাণ বলে ডাকতাম, মোনালির বাবা।
- হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? তুমি সেবছর ইউনিভার্সিটি শেষ করলে। আমি অফিস শেষ করে মাঝে মাঝে তোমাকে ইকলাস সাহেবের বাংলা মোটরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে রিক্সায় করে আমরা আমাদের গোপিবাগের বাসায় ফিরতাম।
- ইলাদের বাংলামোটরের দোতলা বাগান বাড়িটা কি সুন্দর ছিল! অথচ এখন কি একটা শ্রীহীন হাইরাইজ এ্যাপার্টমেন্ট।
- হ্যাঁ, ইকলাস সাহেব যতদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন ছিল। ওরা সবাই তো আমেরিকা চলে গেল। দেখাশুনা করার জন্য তো লোক লাগে।
- কেমন করে আমাদের প্রথম জীবনের ঢাকা বদলে গেলো চোখের সামনে। বিশ্বাস হয়না! তাই না?
- তোমার ওখানে কেমন লাগছে এখন?
- এদের জীবন তো তুমি দেখেছো। সবাই ব্যস্ত। নির্ভানাকে নিয়েই সময় কাটাই। ও আমি কখনো টেলিফোন বা কম্পিউটারে বসলেই কাঁদতে শুরু করে। আপু সোনামনিটা, আমার এতো ন্যাওটা হয়েছে! আমি ফিরে গেলে মোনালি কিভাবে যে ওকে ডে কেয়ারে এ্যাডজাস্ট করাবে আল্লাহ জানে। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
- ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চা মানুষ তো, কদিন গেলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। তুমি সময় পেলে কি করো? টিভি দেখো?
- নাহ। এদের এখানে তো বাংলা চ্যানেল এখনো নেই। এই নেইবারহুডে বাঙ্গালী তেমন নেই। তাই পে চ্যানেল হিসেবে নিতে গেলে অনেক খরচ বলে ওরা নেয়নি। আর ওদের টিভি দেখার সময় কোথায় বলো? মোনালি আমাকে কম্পিউটারে ইউটিউব বলে একটা জিনিস আছে, ওটা দেখিয়ে দিয়েছে। ওখানে নাটকগুলো দেখি। ঢাকা থেকে দেশ পত্রিকার যে স্বারদীয় পূজা সংখ্যা দুটো এনেছিলাম ওগুলো তো কবেই শেষ।
- হ্যাঁ। আমাদের জন্য ওসব দেশ নয়। এজন্য গেলেও আমার বেশি ভাল লাগে না।
- আমার খুব দিপালির জন্য দুঃশ্চিন্তা হয়। মোনালির আব্বু, তুমি বা আমি জীবনে তো সজ্ঞানে কারো কোন ক্ষতি করিনি। কোন অন্যায় করিনি। তাহলে আমাদের মেয়েটার জীবনে এমন হলো কেন? ওর যে কি হবে? আমার কিন্তু মেহরাব ছেলেটাকে প্রথম থেকেই ওতো ভাল লাগতো না। দিপালির নিজের পছন্দ দেখে তখন আর বাধ সাধিনি। দেখো শেষ মেষ কি পরিনতিটা হলো মেয়েটার।
- হ্যাঁ। মেয়েটার জীবনটা ওলোটপালোট হয়ে গেল। ও ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির সময় কাটাচ্ছে। আমাকে অবশ্য ধরা দেয় না। খুব খাটছে জিআরই পরীক্ষার জন্য। ওর ইচ্ছা এখন আরো পড়াশুনা করার। তুমি চিন্তা করো না, শিক্ষিত মেয়ে, ভাল চাকরি করছে। ভাল ছাত্রী ছিল। ওর ভবিষ্যত ও নিজেই ঠিক করে নিতে পারবে।
- বললেই তো আর চিন্তা থামানো যায় না। মেয়েটার কি হবে ভেবে রাতে আমার ভালভাবে ঘুম হয়না। তুমি তো জীবনে সংসার আর মেয়েদুটো নিয়ে কিছু ভাবলে না। অফিসে ছিলে সিরিয়াস কাজের মানুষ আর বাসায় উদাসী বাবা।
- তুমি ছিলে দেখেই কোনকিছু নিয়ে ভাবতে হয়নি।
- ওগো শোনো। মান্নান ভূঁইয়া সাহেবের কুলখানিতে গিয়েছিলে তুমি?
- গিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট পেয়ে ধুকে ধুকে মারা গেলেন লোকটা। তার চাইতে বড় কথা এতো বড় নেতা অথচ রাজনৈতিক গ্লানি নিয়ে চলে যেতে হলো। দাপট, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা সবই নিঃশেষ হয়ে গেল।
- তুমি অমন বলো না তো। মরিয়ম আপার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। আপা কি ভাল মানুষ! তুমি তো জানো, আপা দুই ছেলেকে রান্না ঘরে পড়িয়ে মানুষ করেছেন। কত কষ্ট করেছেন।
- তুমিতো সবকিছু মরিয়ম আপাকে দিয়ে বিচার করো। এখন উনি গুলশানে থাকেন। এটিই সত্য। নব্বইয়ের আগে আর পরে মান্নান ভূঁইয়া সাহেবের দুই জীবন। ওনার মতো শিক্ষিত পোড় খাওয়া মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিক যদি বিএনপিতে থেকে জামাতীদের সাথে ট্রেড অফ না করতো তাহলে আজ রাজাকারদের এমন রমরমা শক্তিশালী অবস্থা হতে পারে কোনদিন। উনি তো খালেদা জিয়ার ডান হাত ছিলেন, কী করেছেন?
- উনি কিন্তু ওনার ন্যাপ এবং ইউপিপি ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে বিএনপিতে ভেতরে এবং বাইরে জামাতীদের বেশ চাপে ছিলেন।
- ওগুলো বাহাস। বাইরে বাইরে ওরকমটাই মনে হতো। তাহলে বাম দলগুলো এবং আওয়ামীলীগের সাথে পলিটিক্যালি যোগাযোগ রাখতে সুবিধা হয়। ভেতরে ভেতরে সবাই একাট্টা ছিল।
- তা হয়তো হবে। মরিয়ম আপা আমাকে অনেক স্নেহ করেন। আমি আপাকে সহকর্মী হিসেবে কাছ থেকে দেখেছি। উনি দারুন একজন মানুষ। কত গুন ওনার। তুমি আপার সাথে দেখা করতে পেরেছিলে?
- না। কুলখানিতে পুরুষ মহিলা আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল। আর শাহজাহান বলে রেখেছিল ওকে যেন একটু আগে ছেড়ে দেই। ও ওইদিন রাতে ভোলায় ওর বাড়িতে যাবে বলে রেখেছিল। ছুটি নিয়েছিল দুই দিনের। গাড়ি থাকবে না দেখে একটু আগেই বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল মিলাদ শেষ করেই। তাই আর সুযোগ হয়নি।
- দেখি। একদিন আপাকে ফোন করে কথা বলতে হবে।
- হ্যাঁ, কথা বলো। আর তোমার ফ্লাইটের টিকেটটা হলে আমাকে ডিটেইল আইটেনারিটা জানিও।
- আচ্ছা জানাবো। ফোন ছাড়ছি এখন। নির্ভানা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে মনে হয়, কাঁদছে। তুমি একটু দিপালির খেয়াল রেখো। ওকে বলো কাল ওর সাথে কথা বলবো। আর তুমি রাত না জেগে ঘুমিয়ে পড়ো।
- ভালো থেকো ‌তোমরা। অরিত্র আর নির্ভানাকে আমার আদর দিও। মোনালিকে বলো আমরা ভাল আছি।
- সাবধানে থেকো। ছাড়ছি, পরাণ।
- আচ্ছা। খোদাহাফেজ, পিংকী।

শিরোনামহীন কথোপকথন – তিন


-  হ্যাল্লো, জান্টুস! দেরি হলো কেনো ফোন রিসিভ করতে? আমি সেই কখন থেকে ট্রাই করতেছি।
- স্যরি, বাবু! আমি তোমাকে এফ,বি-তে অনলাইন দেখে বাজ দিয়ে বসে ছিলাম। ফোন ছিল ব্যাগে। বুঝবো কি করে বলো? রিংগার, ভাইব্রেশন সবই তো অফ করে রাখতে হয়। তোমার কোন ট্রেইস না পেয়ে এইমাত্র ফোন চেক করলাম।
- ওক্কে, ওক্কে, বুচ্ছি। বাট ফোনটা তুমি চেইক করবা নাহ?
- সুইটু বেইবি, তুমি কিন্তু অলওয়েজ কমপ্লেইন করো। আমার বাসার কথা একদম থিঙ্ক করো না। বাপি মাম্মি যদি জানে আমার কাছে সেলফোন আছে, আমাকে স্ট্রেইট বাসা থেকে বের করে দিবে।
-  নো চিন্তা। তখন তুমিও স্ট্রেইট আমার বাসায় চলে আসবে। হেঃ হেঃ হেঃ
- আহ! আহল্লাদে আর বাঁচি না। আর আংকেল আন্টি ব্যান্ড পার্টি নিয়ে তোমাদের গেইটে আমাকে রিসিভ করবে। তাই না, বেইবি?
-  করবেই তো। শোন জান্টুস, আজ রাতের স্কাইটা জোস সুন্দর, আই থিংক, পূর্নিমা। মুনটাকে যা লাগতেছে না ছাঁদ থেকে …
- হোয়াট? তুমি ছাঁদে এখন? আর ইউ কিডিং মি?
- কি করবো? তোমার সাথে আমার ফিসফিস করে করে কথা বলতে একটুও ভাল লাগে না। আব্বু ঘুমাতে আরো অনেক দেরি। আম্মু যেই ঘুমাতে গেছে আমি ছাঁদে চলে এসছি। মন খুলে কথা বলতে না পারলে কিছু হইলো?
- সি, ইউ আর এ্যা গাই এন্ড তোমার যা খুশী তুমি করতে পারো।
-  ইয়া, ড্যাটস ট্রু। বাট, এইটা তো আমাদের বাসা, আমরাই থাকি। তুমি এখন তোমাদের এ্যাপার্টমেন্টের ছাদে উঠবা আর কে না কে থাকবে …
- আমি ছাদে উঠতেছি নাতো, বাব্বা! জাস্ট বলছি। এ্যাই, তুমি বিকালে বললা যে পরে বলবা কোথায় গেসিলা, বলো এখন …
-  আররে আইমানের সাথে ড্রাইভে গেসোলম আশুলিয়ায়।
- তুমি আর আইমান? নাকি প্রীতমীও ছিল?
- আররে আইমান আর প্রীতমী আমাকে ম্যাবস থেকে তুলছে। আইমানের একা ড্রাইভে যেতে ভয় করে।
- শেইম! শেইম! বুঝছো? ওরা ডেইটে যায় আর তুমি ওদের বডিগার্ড।
- ফালতু কথা বলবা নাতো! আজীব! কোইথেক্কে কি?!
- শাট আপ। এই জন্য তুমি তখন আমতা আমতা করতেছিলা। তাইনা? লিসেন, ন্যাও ইউ আর মাই বয়ফ্রেন্ড। তুমি কারো বডিগার্ড হতে পারবা না। বুচ্ছো, আমার কথা। তোমার প্রেসটিজ না থাকতে পারে, বাট আমার আছে। আদারওয়াইজ, ফরগেট মি।
- ওক্কে বাবা। মাফ চাইছি। হইছে? প্লিজ! … [পাঁচ সেকেন্ড] কি কথা বলো না কেন?
-  হিসসস… মাম্মির পায়ের সাউন্ড পেলাম মনে হয়। ওয়েট। [চাঁপা গলায়]
- কত্ত যে হাজারটা প্রবলেম! একটু শান্তিতে কথা বলাও যায় না।
-  ইউ নো, কোন ভদ্রলোকের বাসাতে মাঝরাতের পর কথা বলা এলাউড না। তুমি লাকি যে আমি তোমার সাথে তাও কথা বলি। বুচ্ছো?
- ক্যান? আমি বলছি নাকি যে তোমার বাপি মাম্মি অভদ্রলোক?
- ইউ ইভেন ডোননো হাউ টু টক উইথ এ্যা গার্ল! আজীব! লিসেন, পৃথিবীতে সভ্যতা, ভব্যতা বলে কিছু ওয়ার্ডস আছে। ওগুলা তো না জেনেই এই ডিকেইডটা কাটাইলা। আই জাস্ট হোপ তুমি এগুলা একটু শিখো এখন।
-  জান, আমাদের পিৎজাহাটের ছবিগুলা ফেইসবুকে আপলোড করিইইই? সেইদিন থেকে আইমান আর প্রীতমী অনেকবার রিকোয়েস্ট করছে। তোমার আর আমার ছবিগুলা যা জোস আসছে না!
-  করো, বাট সিকিউরিটি য্যানি স্ট্রিক্ট থাকে। আমাদের গ্রুপের বাইরে কেউ য্যানি দেখতে না পায়। আর তুমি রুমপাকে ব্লক করবা তোমার একাউন্ট থেকে। ও কিন্তু আমার মেজ ফুপিকে সব বলে দেয় আমি কই যাই, কি করি, কার কার সাথে মিশি। ওকে একটা লেসন দিতে পারলে যে আমার কি শান্তি লাগতো। ইটস ঠু মাচ!
- আররে তুমি এইটা নিয়ে কোন চিন্তা কইরো না। রুমপাকে আমি পুররা লিমিটেড প্রোফাইল করে রাইখা দিসি। আর দাড়াও, ও যে সাকেরের সাথে ডেইট করে এইটা আমি জানাইতেছি সবাইকে। দেইন, দেইখো কি হয়!
-  লাব্বোউ সো মাচ, বেইবি! তুমি এত্তো স্মার্ট। এইটা আমার মাথায়ই আসে নাই।
-  লাব্বোউ ঠু, কুইটি পাই! তুমি আমাকে এতোদিনে বুঝলা? ম্যালা দেরি হয়ে গ্যালো না?!
- তুম্মি না বেইশি বেইশি।
-  এ্যাই, শোনো … কালকের প্ল্যান কি? আমি পোকা জালালের বায়োলজি প্রাকটিক্যাল ক্লাসটা কইরাই দুপুরে কলেজ থেকে ফুটবো।
- আরে আর বইলো না। রোয়েনা আপা গেইটে এমন টাইট দিয়ে দিসে যে কেউ বের হইতে পারেনা। বাট, আমি কালকে প্রীতমীদের সাথে সাইন্স ফেয়ারের স্টলে থাকবো। দেইন, চান্স পাইলে জুনিয়র সেকশনের ছুটি হলে বের হয়ে যাবো। তুমি ক্রাঞ্চিতে থাইকো, তাইলে আমি এটলিস্ট দোতলায় একবার দেখতে পাবো। তারপর আমি কল দিবো।
- ওহ নো, ক্রাঞ্চির সামনে দাড়াইতে পারবো না। ওইখানে দাড়ালে তোমাদের মেয়েরা বারান্দা থেকে ভ্যাঙ্গায়। আই হেইট ক্রাঞ্চি। আর সব ছ্যাবলা পোলাপাইন ওইখানে গুতাগুতি করে। আমি আইদার হেলভেশিয়ার ভিতরে অর সাগর পাবলিসার্সের সামনে থাকবো।
- তোমার না যত্তো ঢং! এবার সায়েন্স ফেয়ার যদি ওপেন থাকতো তাইলে তো ঠিকই মেয়েদের কলেজে ঢুকতা। তখন তো আর মেয়েদের ভ্যাঙানোর কথা মনে থাকতো না। তুমি না, রিড্ডিকুলাস!
- নো ওয়ে … আমি তোমাদের ভিক্কিদের থেকে একশো হাত দূরে থাকি। ওপেন থাকলেই কী, আমি জীবনেও যাইতাম না।
- এহ! আই নো ইউ বেটার দ্যান এনিওয়ান। থাক, আর কিছু বল্লাম না। লিসেন, থার্সডে কিন্তু লাস্ট কলেজ ডে। দেইন, ঈদের ছুটি হয়ে যাচ্ছে এডভান্স। সো, এইটা মেইক করতে হবে।
- জান্টুস, বলোতো, তুমি ঈদে কি চাও আমার কাছে?
- কিচ্ছু না, মাংকি বেইবি। বাট, আইমান প্রীতমীকে যেই রকম খ্যাত গিফট দেয়, ভুইলাও কোনদিন আমাকে ওইসব দেবার কথা ভাববা না। ড্রেসিডেল, মান্ত্রা থাকতে কই কই থেকে কিনে, গড নোস! আমি তোমার জন্য সোল ডান্স থেকে জোস একটা ব্রাউন ফতুয়া কিনছি। কাল দিবো, বেইবি।
- চলো তাইলে কাল গুলশানের দিকে যাই কলেজ থেকে। দেইন, তুমি চুজ করো যেইটা ভাল লাগে তোমার।
- মাথথা খারাপ নাকি! জ্যাম কিরকম দেখছো? গুলশান যেতে যেতে কলেজ ছুটির টাইম হয়ে যাবে। বেলায়েত ভাই গাড়ী নিয়ে ওয়েট করবে কলেজের সামনে। ফিরবো কিভাবে তখন?! সো, গুলশান প্ল্যান ক্যানসেল।
- ওক্কে দেইন, ছুটিতে একদিন প্রীতমীর বাসার কথা বলে ম্যানেজ করো। এ্যাই, আমার ফোনের চার্জ শেষ মনে হয়, বিপ করতেছে।
- উফঃ যেমন তুমি, তেমন তোমার ফোন। কোননো টাইম সেন্স যদি থাকতো।
- তোমার বাসার লোকগুলার থেকে অনেক বেশি সেন্স, বুঝলা? তোমাকে তো আংকেল-আন্টি এখনো স্পুন ফেড বেইবির মতো ট্রিট করে।
- স্টপ ইট, বাবু। ফোন রাখার আগে এখন কুয়্যারেল করবা?
- স্যরি, জান্টুস হানি। কাল অন্নেক ফান করবো। টেইক কেয়ার।
- টেইক কেয়ার, সুইটু বেইবি। সিয়াহ। উম্মাহ!
- বাই, জান্টুস। উম্মাহ! উম্মাহ! উম্মাহ!
[টুট, টুট, টুট ... সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।]

Wednesday, August 18, 2010

অদ্ভুত আঁধার এক




১.
গরমটা যা জাকিয়ে পড়েছে এবার। বিশ্রি এক অনুভূতি সারাদিন। উফঃ দিনে কোথাও এক দন্ড বসে থাকার উপায় নেই, ঘামে গায়ের কাপড় ভিজে জব জব করে সারাক্ষন। রাত ৯টা। রোকেয়া হল, মেইন বিল্ডিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাতের এই সময়টুকুতে বারান্দার রেলিং এ বসে রুমের ক্যাসেটে জোয়ান বায়েজ ছেড়ে অন্যরুমের সুখদুঃখে আড়ি পাতার মতো এক চিলতে আনন্দ ঢাকার আর কোথাও নেই। এই সময়ে সবাই বাইরে থেকে হলে ফিরতে শুরু করে। কারো চেহারায় থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্নে বুদ হওয়া সুখের স্পষ্ট শিহরণ, কারো চেহারায় থাকে প্রাইভেট টূইশনি করে ফেরা মলিন ক্লান্তি, কেউবা হারানো, প্রাপ্তি ও সংকটের জটিল হিসাব করতে করতে ভ্রু কুচকে বিশ্ববিদ্যালয়, সেশনজ্যাম ও ঢাকা শহরকে তুচ্ছ করে, আবার কেউ নিত্যদিনের হাহাহিহি, ফুচকা, পুরি, সিঙ্গারা সহ আড্ডার ঝিলিক মুখায়বে ফুটিয়ে হলে ফেরে। আমি ঠিক বুঝতে পারিনা আমি কোন দলে সত্যিকারে পড়ি। আমার ধারণা আমি গোত্রহীন আমাদের হলের রেইন ট্রিটার মতো অসাড়তা নিয়ে বেচেঁ আছি। যেন এক একটি ঋতু পাল্টায় আর আমি শুধু পাতার রঙ বদলাই।

আমার নাম অনন্যা রহমান। আমি অর্থনীতি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ডিবেট করি। সেই যোগ্যতাকে বিবেচনা করে হলের প্রয়োজনে ঢাকায় বাসা থাকা সত্তেও দিব্যি আমাকে হলে একটি সিট দেওয়া হয়েছে। আগে ভারতনাট্যম শিখতাম, অনুষ্ঠানেও নাচতাম, এখন ছেড়ে দিয়েছি। আমি হলে থাকাটা দারুনভাবে উপভোগ করি। আমার রুমমেট মুনমুন এবং সোনালি। ওরা আমার বিভাগের। আমরা ব্যাচমেট এবং বন্ধু। ওদের কারনেই আমার এই মেইন বিল্ডিংয়ে রুম নম্বর এইট্টিতে ওঠা। আরেকটা মেয়ে আছে আমাদের রুমে, নাম অরণি। ফার্মেসিতে পড়ে। মেয়েটা ভাল, কিন্তু ও একটু অন্যরকম। কিংবা হয়তো আমাদের কারণে কোনঠাসা। জীবনকে সুক্ষ ও বিচিত্রভাবে দেখার এবং অপার স্বাধীনতা উপভোগ করার মতো এর চেয়ে চমৎকার ব্যবস্থা আমার বাইশ বছরের জীবনে কোথাও কোনদিন ছিল না। আমার সরকারি চাকুরীজীবি সৎ বাবা-মা তাদের সাধ্যের ভেতর আমাকে কোন কিছু দিতে কার্পণ্য করেননি। একটি মেয়ের মেয়ে ওঠার জন্য পারিপার্শিক প্রতিবেশে যা কিছু প্রয়োজন তারা কোনকিছুর কমতি রাখেননি। আমিও খুব পরিপূর্ন ছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীবন আমার সেই গুডি গার্ল সত্ত্বাকে ওলোটপালোট করে দিল। আগে আমি বেছে বেছে এমন সব উপাদানে আমার জীবনকে সাজাতাম যাতে আমার বাহবা কুড়ানো নিরাপদ জীবনকে ইর্ষা করে মানুষ। কিন্তু এখন আর আমি সেই জীবনে কোন স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। জীবনকে আমার এখন পরীক্ষা করতে ভাল লাগে। হয়তো আমি ভুল, কিংবা আমি জানি না কি ভুল বা সঠিক। কিন্তু আমি পরীক্ষণ করি, অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভরিয়ে তুলছি এবং এটাই আমি চাই। এই কথাগুলো কিন্তু আমি সরাসরি বলতে পারিনা। আমি সবার সাথে মিলে মিশে এমনভাবে থাকি, কাউকে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দেই না। আমার এই হলে থাকা জীবনটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়। বিশেষত টয়োলেট এবং বাথরুম – যারা হলে থেকেছে তারা এটা জানেন, হল জীবনের মর্ম হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করেছেন। সেটাও মনে হয় আমার এখন সয়ে গিয়েছে। আমার ছোট বোন রেবুতি এসেছিল কয়েক সপ্তাহ আগে আমার হল জীবন কেমন দেখতে। সবই ঠিকঠাক ছিল কিন্তু ও বাথরুম থেকে ফিরে এসেই অস্থিরভাবে কঠিন স্বরে আমাকে বললো,

– এক্ষুনী ব্যাগ গুছাও। তুমি এখানে থাকতে পারো না।

আমি জানতাম ও এমন কিছুই বলবে। কিন্তু আমি আমার হলে থাকার সিদ্ধান্তে অনড়। ডাইনিং আর টিভি রুমে কি অবস্থা হয়, তা কেউ না দেখলে কোনদিন বুঝবে না। ভাগ্যিস রেবুতি ওদিকটায় যায়নি। অবশ্য ধারণ ক্ষমতার তুলনায় এত বেশি মেয়ে কিছু করারও হয়তো নেই। রেবুতি এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বাসায় আমার ঘরে ফেরা নিয়ে। বাপি-মামনিও হলে ছিলেন ছাত্রাবস্থায়, তাই তারা জানেন এসব। খুব বেশি বিচলিত হননি। কিন্তু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, রেজাল্ট যেন ঠিক থাকে। আমি অবশ্য পড়ালেখার ব্যাপারে বেশ সিনসিয়ার। আসলে আমার ফলাফল কিন্তু স্কুল-কলেজ সবজায়গায় ভাল ছিল। তাই এখন অনেকটা এমনিতেই তাগিদটা এসে পড়ে। আর ফলাফল ভাল করার জন্য খুব যে পড়তে হয়, তাও না। আমি বরং পাঠ্যের বাইরের যে একটা বিকশিত ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশ আছে সেটির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেই। সত্যি কথা বলতে, সেই পরিবেশটা যে খুব বেশি স্বাস্থ্যকর তা কিন্তু নয়। নানা রকম কাঁদা ছোড়াছুড়ি। তবে আমি মেয়ে হিসাবে সবসময় একটা আলাদা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকি। শুধু তাই কেন, বাহূল্য আগ্রহ এবং আমাকে নিয়ে টানাটানির যে একটা ব্যাপার হয় সেটা আমি ভালই বুঝি। এসব নিয়ে প্রথমে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম, এখন ঠিক ঠিক সামলে নিয়েছি। আমি এখন জানি ঠিক কোন সময় নিজেকে সরিয়ে আনতে হয় ঝামেলা ছাড়াই। তবে শিক্ষক এবং ছেলেগুলোও বলিহারি, বাইরে একটা ভালমানুষি মহৎ প্রাণ ইমেজ ঝুলিয়ে রেখে পেটেপেটে এত ছোঁক ছোঁক করা স্বভাব। তবে, সবাই যে এমন তাও নয়। আসলে ভালরাই হয়তো বেশি। কিংবা ভাল-মন্দ মিলেই হয়তো মানুষ। তবে প্রতিষ্ঠিত ইন্টেলিকচুয়ালদের চেয়ে উঠতিরাই বরং ভাল এবং নিরাপদ। একটি ব্যাপার আমি বেশ বুঝে গিয়েছি, আগে অনেককে খুব বড় মাপের মানুষ বলে মনে হতো। এখন জানি এই বড় মানুষগুলোরো কদর্য দিক রয়েছে। প্রথমে মেনে নিতে পারিনি, ধাক্কাটা সামলাতে বেশ সময় নিয়েছি। এখন আর এসব ভেবে খারাপ লাগেনা। হয়তো ডিবেটটা না করলে এই জগতের কথা আমার অজানাই থেকে যেত।

২.
আমি খেয়াল করছি রাজকুমারী গত কয়েকদিন ধরে একা রেলিং ধরে উন্মনা হয়ে দাড়িয়ে থাকে। কখনো কখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে পায়চারি করে। রাজকুমারী থাকে আমাদের দুইরুম পর। আমার রুমমেট সোনালির সাথে বেশ সখ্যতা। মাঝেমাঝে আমাদের রুমে আসে। আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের ছাত্রী। আমরা ওকে রাজকু বলে ডাকি। রাজকু অদ্ভুত এক নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। হয়তো ভরা পূর্নিমার চাঁদটাকে মন ভরে দেখছে। তাই আমি আর ওকে বিরক্ত করিনি। একইভাবে নির্জনে প্রায় ঘন্টাখানেক দাড়িয়ে থাকতে দেখে, আমি যেন পায়চারি করছি এমনভাবে ওর কাছে গেলাম। আমাকে খেয়াল করলো না। চেহারায় কেমন উৎকন্ঠা, দুশ্চিন্তা আর অসহায়তা নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। ওর এই অবয়ব দেখে আমার ভেতরে কেমন একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেল। আমি সন্তর্পনে ওর হাতটা ধরতে ও যেন সম্বিত ফিরে পেল,

- ও অনন্যা তুই!
-  কি হয়েছেরে রাজকু?
-  কই? কিছুনারে।
-  না তোকে অনেকক্ষন দেখলাম একইভাবে আছিস। ভাললাম কিছু হয়েছে কিনা।

রাজকু স্মিত একটু হাসলো। সে হাসি একেবারে নৈবত্তিক। সুখ-দুঃখ কিছুই বোঝালো না তাতে। শুধু বললাম – কোন সমস্যা হয়ে থাকলে বলিস আমাকে। রাজকু কোন উত্তর দিল না।
আমি রুমে চলে এলাম। সোনালি বাড়িতে গিয়েছিল। সিলেট থেকে ওর মা আমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছেন। মুনমুন আর আমাকে আগে বলে রেখেছিল, আমরা সেটা দিয়ে রাতে খাবো। সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস রান্না। আমার তেমন ভাল লাগে না, আমি জানি মুনমুনও যে আহামরি পছন্দ করে তেমন নয়। কিন্তু গত সাতমাস ধরে দেখছি, সোনালি বাড়ি গেলে আমাদের জন্য সাতকরার কিছু একটা আনবেই। খাবার এবং গল্পগুজবে আমি রাজকুর কথা ভুলে গেলাম।

৩.
পাচঁ দিন পর। ঠিক ভর দুপুরে। কলাভবনের তিনতলা। আমি ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্যারের রুমের সামনে দাড়িয়ে ইকোনোম্যাট্রিক্স বইটার পাতা উল্টাচ্ছিলাম। আমার হাতে একটা ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতে তাকিয়ে দেখি রাজকু। আমি বইটি বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিলাম। রাজকুর চুল এলোমেলো। কাপড় অপরিপাটি। চোখের নিচে কালি, চোখটা খুব শুকনো। দেখে মনে হলো হয়তো ঠিকমতো ঘুমায়নি কতকাল। এমন মলিন আমি কোনদিন ওকে দেখিনি।

- তোর একটু সময় হবে?
- একশোবার হবে। কি হয়েছে বলতো রাজকু?

রাজকু কোন কথা বলে না। যেন একটি নিথর মানুষ দাড়িয়ে। কিছুক্ষন স্থির তাকিয়ে থাকে আমার চোখে, তারপর সামনের কোয়াডের সবুজ গাছটার দিকে তাকায় এক দৃষ্টিতে একটু যেন ঋঝু ভঙ্গিতে। আমিও এক মূহুর্ত ওর চোখে তাকিয়ে কি বলবো কথার খেই হারিয়ে ফেলি। একসময় দেখি ওর চোখ গড়িয়ে এক দুফোটা পানিও পড়ে অসচেতনভাবে। সেটা আবার হাতের তেলোয় মুছে নেয়। আমার হাতটি হটাৎ একসময় সয়ংক্রিয়ভাবে রাজকুর কাধে ভরসার পরশ বুলাতে থাকে। হয়তো তাতে কোন কাজ হয়না। করিডোরে অন্য কোন বিভাগের একটি বেঞ্চ পড়ে ছিল। আমি ইশারা করি সেখানে গিয়ে বসার। আমরা বসি। কিংবা সময়ের ভেতর সময় হারিয়ে ‌ফেলি।

৪.
রাজকু আর রাদিনের সম্পর্ক দুবছর গড়ালো। ফার্ষ্ট ইয়ার পেরিয়ে একদিন রাজকু-রাদিন বিহঙ্গ হবার স্বপ্ন দেখে। ওরাও হয়তো খেয়াল করেনি হাতে হাত রেখে রঙ্গীন পেখমমেলা দিনগুলো কিভাবে এগিয়েছে। রাদিনের সাথে আমার ডিবেটের সূত্রে চেনাজানা। রাদিন খুব সপ্রতিভ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভাল ডিবেটর। পড়াশুনা জানাও বেশ, আর কি তীক্ষ্ণ যুক্তিখন্ডন করে! আমার বিশ্বাস রাদিন একদিন ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির কেউ একজন হবে। রাদিনের আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের একজন শিক্ষক হয়ে যাওয়াও অসম্ভব কিছুনা। কিংবা একজন ক্যারিয়ার ডিপ্পোম্যাট। রাজশাহীর কলেজ অধ্যাপক বাবা-মায়ের প্রাণের টুকরো রাজকুর জন্যে বসন্তের আলো ঝলমল দিনের মতো একটি ভবিষ্যত আমি দিব্য চোখে এঁকে রেখেছিলাম। হয়তো তেমনটাই হবে। কিংবা মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। জীবন কখনো এসে গতিপথ পাল্টায়। কিংবা থমকে দাড়ায় মূহুর্তের জন্য। তাতে আমরা কখনোবা খানিকটা সংশয়বাদী হয়ে পড়ি। রাজকুর শরীরে একটি ছোট্ট ভ্রুণ তীর তীর করে বেড়ে উঠছে। একটি জীবনের আভাস। হতে পারতো ওর জীবনের সবথেকে আনন্দের। সেই অনাগত জীবন এখন একটি বিভীষিকা রাজকুর অস্তিত্ত্বে। আমি রাদিনকে ফোন করি, দেখা করবো বলে। রাদিন গুলশানে, লিভার ব্রাদার্সের অফিসে আন্তঃ বিভাগ রম্য বিতর্ক প্রতিযোগিতা “সখী ভালবাসা কারে কয় …” এর জন্য ফেয়ার এন্ড লাভলির স্পন্সর মিটিংয়ে। আমাকে জানায় সন্ধা সাতটায় মধুর ক্যান্টিনে আসতে।

ঠিক সময়ে আমি যাই মধুতে। সন্ধা তখন লাগো লাগো। একটি ঘোর করা মাদক আলো, দলা দলা ধোয়া আচ্ছন্ন করে রেখেছে সময়টিকে। ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে আযান ভেসে এলো। মধুদার ছেলে ধুপধনু ধরিয়ে পাত্রটি হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে তুলসিতলা আর ক্যাশ কর্নারের মধ্যে দৌড়োদৌড়ি করছে। এই সময়টিতে লীগ বা দলের ছেলেরা থাকে না সাধারনত। পশ্চিম কোনার বড় টেবিলটি ছাত্র ইউনিয়নের দখলে। সেই টেবিলে ক্যামেলিয়া কিছু একটা বলছে, মানবেন্দ্র মনোযোগ দিয়ে সেটি শুনছে, সাথে অন্যরাও। পাশের টেবিলটি ফেডারেশনের কয়েকজন গোল হয়ে বসে আলোচনা করছে। তার পাশের টেবিলে দুচারজন সখের কবি লিটল ম্যাগ নিয়ে কথা চালাচ্ছে। আমি জানালার পাশের দুজন বসা যায় এমন আইবিএ-মূখী একটি টেবিলে বসে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিলাম। রাদিন এলো আরো কুড়ি মিনিট পর। ওর সপ্রতিভ হাসিহাসি আপন করে নেওয়া মুখটা আমাকে সেদিন একটুও টানলো না। আমরা বসলাম একত্রে। আমি কোন ভনিতা না করে বললাম,

– রাদিন, রাজকুর এখন কি হবে?
ভূত দেখলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, রাদিন তেমনি ভীষন ভয় পেলো যেন। আমাকে বললো,
- মধুতে নয়, অন্য কোথাও কথা বলি, চল।
- শোন, আমি তোদেরকে সাহায্য করতে চাই। এখানেই ঠিক আছে।

আমি অভয় দিলাম। বুদ্ধিমান ছেলে, কথা না বাড়িয়ে আমাকে হাতেপায়ে ধরলো ওকে বাঁচাবার জন্য। আমার তাচ্ছিল্যের হাসি রাদিনকে বুঝিয়ে দিলো যে বাঁচার প্রশ্নটি এখন সবথেকে বেশি একটি অনাগত ঘুমন্ত জীবনের। অনেক বেশি রাজকুর। ওরা রাদিনের চেয়ে অনেক অনেক দ্বিধান্বিত শরীরী এবং জাগতিক জীবনের বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষনে। আমি হয়তো একটু বোকা। রাদিন কথায় কথায় আমাকে কেমন করে যেন রাজকুর দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। আমি মেনেও নিলাম। রাদিনের আবেগময় অসহায়ত্তে আমি পরাজিত হলাম। হয়তো একজন মেয়ে বলেই, কিংবা জানিনা নিজেকে রাজকুর জায়গায় দাড় করিয়েছিলাম বার বার, সেই দূর্বলতা থেকে, আমি রাজকুর পাশে দাড়ালাম। পুরো বিষয়টি শুধু আমাদের পাঁচজন মানুষের ভিতরে থাকলো। আমি গসিপ করা একদম পছন্দ করি না। সোনালি এবং মুনমুনকে বলে রেখেছি, এটা যেন আর একটি মানুষও জানতে না পারে। সোনালি আমাকে বার বার বারণ করলো এসবে না জড়াতে। কিন্তু আমি তো ওসব গা বাঁচানো কথা শোনার মতো লক্ষী মেয়েটি নই।

৫.
ক্লিনিকটি মুহম্মদপুরে। নিচতলার প্যাথোলজি বিভাগটি যেন নামকাওয়াস্তে। কেমন শ্যাতশ্যাতে আর বদ্ধ। দেয়ালে পোষ্টারে সাঁটা একটি শিশু গর্ভের ভেতর গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। ডাক্তার তেমন চোখে পড়লো না। এককোনায় একটি ফুলের টবে মৃত একটি গাছ। সেটিতে এখন পানের পিক ফেলা হয়, গোড়ার মাটি লালচে হয়ে আছে। রাজকু আর আমি খুব সকাল সকাল গিয়ে আমাদের এ্যাপোয়েন্টমেন্টের সময় এবং নাম জানিয়ে রিসেপশনের সামনে খালি চেয়ায়ে বসে আছি। আমাদের সামনের চেয়ারে দুজন মধ্যবয়সি মহিলা বসে, একজন বোরকা পরিহিতা। রাজকু আমার হাতটি শক্ত করে ধরে বসে আছে। ওর ওড়নাটি মাথায় জড়িয়ে রাখা। আমি গত এক সপ্তাহ রাজকুর বন্ধু থেকে যেন নিকটতম একজন আত্মীয়। পরম নির্ভরতায় অসহায় রাজকু আমাকে একটি ভেলার মতো আঁকড়ে ধরে আছে। আমিও কার্পন্য করিনি ভালবাসা দিতে, বুকে জড়িয়ে রেখেছি পাখির ছাঁনার মমতায়। আজ আমারো একটু ভয় ভয় করছে। কি এমন বয়স আমাদের। একজন নার্স বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। হাতে একটি ক্লিপ বোর্ড। ডাকলেন,

- ফারিয়া আফজাল।
- এই যে, আমরা …
-  আসেন আমার সাথে …

রাজকুর ভাল নাম ফারিয়া আফজাল। আমার চোখের দিকে তাকালো রাজকু। ওকে ভীত উদভ্রান্ত কবুতরের মতো মনে হলো। আমি ওর ধরে থাকা হাতে আলতো করে চাপ দিলাম।

- পেশেন্ট কে?
- এইযে, ও পেশেন্ট।
- হাসবেন্ড কোথায়?
- হাসবেন্ড আসেনি। আমি ওর বড় বোন।

ঢাকা শহরে যারা এমআর করায় তারা এসবে সিদ্ধ। সবই জানেন। নার্সটির তীর্যক প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি পড়ে নিতে কাফকা কিংবা কোয়েলো পড়া জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। আমি তাকে একটু সাইডে নিয়ে আলাদা করে একটি হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে সকল প্রশ্নের ইতি টেনে দিলাম।

আমাদের সেই দিনটি ক্লিনিকে থাকতে হলো। খুব গা ঘিনঘিন করা পরিবেশে একটি রাত। পরিবেশের চেয়ে আমার কাছে নিরাপত্তার প্রশ্নটি খুব বেশি করে মনে হলো। অন্য ক্লিনিক থেকে একদম অন্যরকম। মুনমুন এলো খাবার নিয়ে দুপুরে। দুপুর এবং রাতের খাবার একসাথে পুরোনো আইসক্রিমের বাক্সে করে। বিকালে ও হলে ফিরে গেলো। সোনালি আসেনি। প্রথম থেকেই আমার সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করে আসছিল। রাদিন ফোন করে খোঁজ নিল বেশ কবার। অপরাধবোধে ওর নাকি সামনে আসতে ভীষণ সংকোচ হচ্ছে। ওর খরচাপাতি মেটাবার প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিলাম। পরদিন দুপুর নাগাদ রাজকুকে নিয়ে আমি হলে ফিরে এলাম। হলে একটি দিন থেকে রাজকু ওর এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেল। তার দুদিন পর রাজশাহীতে।

৬.
সোনালি, মুনমুন এবং আমি গিয়েছি জগন্নাত হলে বিজয়ার দিন দুপুরে। তারপর পুরোনো ঢাকা ঘুরে হলে ফিরে দেখি রাজকু ফিরেছে হলে। একমাস পর। কি যে মায়াবতী চেহারা হয়েছে ওর। ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্যটাও যেন একটু উন্নত হয়েছে। ও হয়তো মা হলে সবকিছু দারুন পরিপূর্নতা পেতো। রাদিন আমাকে অনেক কাকুতিমিনুতি করেছে আমি যেন ওর ইউনিভার্সিটির ক্যারিয়ার ধবংস করে না দেই। কথা দিতে হবে, কাউকে যেন না বলি। আমার খুব রাগ হলেও ক্ষমা করে দিয়েছি। এক মাস পর রাজকু মেইন বিল্ডিং থেকে রোকেয়া হলের এক্সটেইনশনে ওর রুম পাল্টে নিয়েছে। যা অনিবার্যভাবে হবার কথা ছিল তাই হলো। আনুষ্ঠানিকতার কোন প্রয়োজন ছিলনা। তবু আমরা একদিন জানলাম রাদিন-রাজকুর পথ এখন আলাদা। ধীরে ধীরে রাদিন এবং রাজকু এক রকম আমার জীবন থেকেও দূরে চলে যেতে থাকলো। পরীক্ষা এবং ডিবেট নিয়ে আমি ডুবে থাকলাম। একদিন বাসার চাপাচাপিতে হল জীবনের ইতি টেনে পাকাপাকি আমাদের সোবহানবাগের বাসায় চলে গেলাম। মুনমুন, সোনালি এবং আমার নতুন সব এ্যাডভেনচার আবার একইভাবে চললো। রাদিনের সাথে দেখা হলে এরপর থেকে খানিকটা যেন লেজনাড়া একটি কুকুরের মতো আচরণ করতো। হয়তো ভয়ে কিংবা দ্বিধা সংকোচের অস্বস্তিতে। আমি কথা রেখেছি, কাউকে কিছু বলিনি। রাজকু যেন অনেক দূরের কোন দেশের বাসিন্দা হয়ে গেল ধীরে ধীরে। প্রথমে খেয়াল করিনি, একদিন সোনালি ধরিয়ে দিল যে রাজকু আমাদের এড়িয়ে চলে সচেতনভাবে। একদিন আবিষ্কার করলাম রাজকু যেন আর আমাকে চেনেনা। হয়তো আমরা কোনদিন বন্ধু ছিলাম না। পরিচয় হয়নি। হয়তো এটিই নিয়ম। হয়তো জীবনের এই রীতি আমি জানতাম না। শিখে নিলাম।

৭.
পনেরো বছর পর। আমার অনেক কিছু হবার কথা ছিল জীবনে। আমি হয়েছি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার উপ-সম্পাদিকা। একটি নাট্যদলের সাথেও জড়িত রয়েছি। আমি মূলতঃ স্ক্রীপ্ট লিখি আর পর্দার পিছনে বেশি কাজ করি। আমি যে ছেলেটিকে ভালবাসতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার সাথে আমার মতের অমিল প্রকট আকারে বেরিয়ে আসে লেখাপড়ার পর্ব চুকানোর পর। জীবনের প্রতি নির্লিপ্ততায় আমি আর উচ্চতর শিক্ষার পথে পা বাড়াইনি। মামনি বেশ কজন সুপাত্র ধরে এনেছিলেন আমার জন্য। আমাকে তাদের ভালও লেগেছিল। কোন এক উন্নাসিকতায় সেসব বিয়ের প্রস্তাব ভেস্তে যায়। বাঙ্গালি জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনটি একদিন আমিও করে ফেলি, বিয়ে করি একজন প্রকাশককে। আমাদের সন্তান এখন নালন্দা বিদ্যালয়ে যায়। রাদিন শেষপর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, শিকাগো থেকে পিএইচডি করেছে। তারপর ইয়েল থেকে পোষ্টডক করে এখন ইউনিভাসিটি অব সাউথ ডাকোটার রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের কন্ট্রাক্ট প্রফেসর। হয়তো খুব শীঘ্রি কোথাও টেনিউর ট্র্যাক পজিশন পেয়ে যাবে। রাজকুর সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। এখনো নেই। গতবছর ঢাকায় অফিসার্স ক্লাবের এক বিয়েতে আকষ্মিক আমাদের দেখা হয়। অস্বস্তি কাটিয়ে সৌজন্য কথার সময় জানতে পারি রাজকু এখন জেনেভাতে থাকে, স্বামী ডব্লিউটিওতে উচ্চপদস্থ ফাইনানশিয়াল এনালিস্ট। সোনালির জীবন সবার চেয়ে স্বাভাবিক। ও সত্যিকারে মধ্যবিত্ত ঢাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্বামী ব্যাংকার, নিজে কলেজ অধ্যাপিকা। ছুটিতে নিয়ম করে কক্সবাজার বেড়াতে যায়। অবশ্য গতবছর নেপাল এবং এবছর ভারতে বেড়াতে গিয়েছিল। তবে, একটি সন্তানের জন্য এখনো খুব হাপিত্যেশ করে। মুনমুনের মাষ্টার্সে থাকতে বিয়ে হয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক শিক্ষকের সাথে প্রেম করে। টেকেনি। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে ট্র্যাক পাল্টে এখন কেমব্রিজের কিংস কলেজে শান্তি এবং সংঘর্ষ বিদ্যায় পিএইচডি করছে। আমরা তিনজন এখনো সুযোগ পেলে একসাথে হই। প্রবর্তনার আড্ডায় গিয়ে হই হই করি। আমরা এখন আর রাজকুর এ্যাবোরশন নিয়ে কথা কাটাকাটি করি না, করি আমেরিকার এ্যাবোরশন পলিসি নিয়ে। গাঁজা নিয়ে। দান্তেওয়ারে নিয়ে। পার্বত্য চট্টগাম নিয়ে। ফুলবাড়ী নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টের নারী নিপীড়ন বিরোধী রায় নিয়ে। কিংবা সিমিদের আত্মহত্যা নিয়ে।


*** *** ***
১. শিরোনামটি জীবনানন্দ দাসের কবিতা থেকে ধার নেওয়া। কয়েক দফা উপযুক্ত নাম নিয়ে ঘষামাঁজা করে যখন কিছুই মনোঃপুত হচ্ছিল না, তখন এই নামটি বসিয়ে স্থিত হই।
২. ছবি: সালভাতোরে ফিউম।

শিরোনামহীন কথোপকথন – দুই





-  হ্যালু, ক্যা ফুন করছেন?
-  হ্যালো, সিরাজ ভাই আমি নাসিমা, ঢাকা থেইকা …
-   কিরে নাসিমা? আসোস কেমন? তর ফুন না পাইয়া আমি এইদিকে চিন্তায় পইড়া  গেচিলাম।
- বালা আছি। আফনের খবর কি হেইডা কন?
-  আমি তো সবসময় ভালাই থাক্কি। তয়, দুকানের কামডা ছাইড়া দিসি।
-  হায়! হায়! কন কি?
-  হ, ওহন বইয়া বইয়া রিটারমিন খাইতাছি। হেঃ হেঃ হেঃ
-  আরিকটা কাম পাইছেন নাকি মালিকে খেদাইয়া দিসে?
-   হুন, তর সিরাজ ভাইরে খেদানোর ক্ষেমতা এই দোন্যাই কেরুর নাই…
-   হ, হ, বুচ্চি … আফনেরে আমার চিনা আছে… আফনের মতো আকাইম্যা ব্যাডা আমি দুইডা দেহিনাই।
-   তর এই কথার লাইগা তরে যে আমার কি করতে ইচ্চা করে …
-   এই হুনেন, দুকান থেইকা ফূন করছি, ওহন রঙঢঙের কতা কয়োনের টাইম নাই। আফনে ঢাকা আইবেন কিনা হেইডা কন?
-   ওহন ঢাকায় আমু কেমনে?! আমার কত কাইমকাইজ আছে জানোস?
-   আফনের তো চাকরিই নাই। কিয়ের কাম আফনের? হুনেন, আমাগো খালু জাপান যাইবো দুই মাসের লাইগা। খালাম্মা এট্টা নিজোগো চিন-পরিচয় ব্যাডা খুঁজতাছে বাসায় থাহনের লাইগা। আমি আফনের কতা কইছি।
-   আমার কথা কি কইচোত?
-   কইছি, আফনে আমার বড় কাকার পুলা … হিঃ হিঃ হিঃ
-   তুইতো দেহি ম্যালা চালাক হইয়া গ্যাচোস ঢাকা থাইক্কা! হুন, আমি এট্টু ভাইবা দেহি আর এদিকের কাইমকাইজ সাইজ দিয়া লই।
-   হুনেন, আফনে তো এককান আকামের ঢেকি। ঢাকা আয়োনের একটা ব্যবস্থা হইছে, এইডা কিন্তু আর পাইবেন না। একবার আইলে তখন আরেট্টা কাম জুইট্টা যাইবো। না আইয়া শিবালয়ে বইয়া থাকলে চাকরি কেউ আফনেরে গালে তুইলা দিবো নাকি?
-  মাইয়্যা মানুষ সবসময় এট্টা ফ্যাসিলিটির মইদ্যে ফালাইয়া দ্যায় … হুন…
-   কি হুনুম? আফনের অইলো প্যাটে ক্ষিদা আর মুক্কে লাজ; মেনিমুইখ্যা বরকন্দাজ কুনহানকার… আমারে আর পাইবেন না কইলাম… বুচ্চেন?
-    যা কতা হিকচোছ না! হুন, তর খালু যাইবো কবে?
-   সিপটিম্মরে যাইবো, ওহন তো আগুষ্ট মাস, এ্যার পরের মাসে। খালু যাওনের আগ দিয়া আফনের আইতে হইবো কইলাম।
-   আইচ্চা তাইলে তর খালাম্মারে আমার কথা ফাইন্নাল কইয়া দে।
-   আমি খালাম্মারে কওনের পর কিন্তু মুড়ামুড়ি কর্তে পারবেন না, পাক্কা কথা কন ওহনি।
-    ক্যা? আমার কতা তর কানে ঢুকতাছে না, নাকি? কি কইলাম তরে?
-  চ্যাতেন কিয়ের লাইগ্যা?
-   এ্যা? চেতুম না, উনারে ধইরা সুহাগ করুম! হুন, তর খালুর লগে আমারে ফুনে ধরায় দেস।
-    খালু লাগবো না। খালাম্মাই কেস ফাইনাল। এ্যাগো বাসায় মাগী মোড়ল মিনসে গাড়ল, বুচ্চেন? … আমার আর আফনের লাহান… হিঃ হিঃ হিঃ
-     তরে ওহন সামনে পাইলে থাপড়িয়া তর দাঁত ফালিয়ে দিতাম।
[হিঃ হিঃ হিঃ ... ... ]
-  হুনেন, হুদাই এতো ভাব নিয়েননা। পাটুরিয়ার মন্নান ভাই আমার খুঁজখবর নিয়া যায় রিগুলার। হেই সিয়েনজি চালায়তাছে ঢাকায়। বুচ্চেন? আফনের তো কুনো কামের মুরোদ নাই। নাসিমা এতো সস্তা না! দাম আছে।
- মন্নানের লগে যাবি তো যা। তরে কি আমি বাইন্দা রাখছি?
-  মন্নান ভাইর কতা কইচি আর ছ্যাত কইরা জ্বইল্লা উঠছে, না? ওই মিয়া বুজেন না, আপনেরে ঢাকায় ক্যান আইতে কই? হেইডা কিয়ের লাইগা? যত্তসব।
-  হ, ওহন আর ভুজুংভাজুং মারন লাগবো না। তর যে অদপতন হইতাছে, দিনদিন এট্টা খ্রাপ মাইয়া হইয়া যাইতাছোস।
-   হ, আমি তো খ্রাপ মাইয়া। খ্রাপ মাইয়ার লগে দুই দিন কতা না কইলে আবার আফনের ঘুম অয়না। সিরাজ ভাই হুনেন, মায় কইলো মোমেনা নাকি বাপের বাড়িত ওহন … আপনের লগে দেখা হয়নাই? হিঃ হিঃ হিঃ
-  না, হয়নাই। অয় বাপের বাড়ি আইলে আমার কি?
-  ক্যান? অয় না আপনের পুরানু দিল্লাগি! অয় তো আপনেরে অনেক চাইতো … হিঃ হিঃ হিঃ
-  একটা চটকানি দিমু তরে ধইরা।
- এইযে হুনেন, আমি ওহন ফুন রাখুম। সাত মিনিট হইছে।
-  আপনে খালাম্মার ফুনে ফুন দিয়েন। রিজিয়া বুরে দিয়া করাইয়েন। ডাইরেট কইরেন না কইলাম। খালাম্মায় ব্যাটা মানুষ চাইলে দিবার চায় না। মিজাজ দ্যাখায় পরে।
-  আইচ্চা, করুমনে। তুই বালা থাকিছ। হুন, তর লাইগা লাল চুঁড়ি কিইন্না রাখছি। আহনের হময় আনুমনে।
-   করচেন কি? আফনের পকেড তো এমনিতেই ফুডা, আবার আমার লাইগা কিনচেন? আইচ্চা হুনেন, আমি খালাম্মার কাচ থেইকা কুনফাম হইয়া আপনেরে পাক্কা জানামুনে।
-  হ, ঠিকাসে, জানাইস। কতা হইবোরে নাসিমা। ভালা থাহিছ আর মন দিয়া কাইমকাইজ করিস।
-   আইচ্চা, আফনেও ভালা থাইক্কেন। সিলামালিকুম।
-    হ…।


ছবি: জিওফ্রে হিলার, ২০০৯