- হ্যালো, মোনালির বাবা?
- হ্যাঁ, পিংকী আছো কেমন?
- ভাল। তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? গলাটা কেমন ধরা শোনাচ্ছে …
- না, মানে, ওই যে তোমার বুক শেলফটায় মিড নাইটস চিলড্রেন বইটা ছিল না? ওটা পড়তে পড়তে চোখটা বুঁজে এসেছিল।
- সবই বয়সের ছাপ। তোমাকে আগে কোনদিন দেখিনি তুমি বই পড়ার সময় ঘুমিয়ে পড়তে!
- তোমরা আছো কেমন সবাই? অরিত্র আর নির্ভানার কি খবর?
- আমরা আছি ভালো। মোনালি আর জাভেদ তো এখন অফিসে। অরিত্র স্কুলে গিয়েছে। নির্ভানাকে ঘুম পাড়িয়ে তোমাকে ফোন দিলাম। দিপালি কেমন আছে?
- আছে ভাল। দিপালি গতকাল ওর ফেইসবুকে দেখালো নির্ভানার জন্মদিনের ছবি। অরিত্র বেশ লম্বা হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ছয় বছর হিসেবে গ্রোথ বেশ ভাল মাশাল্লাহ।
- তোমার নাতি হচ্ছে বদের হাড্ডি। বোনটাকে মেরে মেরে তক্তা বানায়। অরিত্রকে দেখলে নির্ভানা আমার কোলে শক্ত হয়ে বসে থাকে।
- ছোট মানুষ বোঝে না। বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের ভার্জিনিয়াতে বেড়াতে যাবার ছবিও দেখলাম। তোমাকে খুব ফ্রেস আর ইয়াং দেখাচ্ছে।
- কি যে বলো না? বয়স এখন ষাট। এখন আবার ইয়াং দেখায় কিভাবে?
- তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন আমাদের ইন্দ্রা রোডের বাসায় তুমি যেমন ছিলে।
- বয়স বিশ বছর কমিয়ে দেবার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি যে সেদিন বললে রাতে রাতে গা টা একটু গরম হয়। একটু ডাক্তারের কাছে যাও না। অনেকদিন তো চেকআপ করাও না। হার্টটা আবার একবার চেকআপ করানো দরকার। আমি দিপালিকে বলে দেই ড. বরেণের ওখানে একটা এপোয়েন্টমেন্ট করে দিক। আর খাওয়া দাওয়া করছো তো ঠিক মতো? আমি নেই কি হচ্ছে কে জানে।
- না মানে, এই বয়সে এখনো ঠিক মতো চলতে ফিরতে পারছি এটাই তো অনেক। তুমি তো ফিরতে আর একমাস বাকি। এসো আগে ঢাকায়, তারপর ডাক্তার কবিরাজের চিন্তা করবো। এখন ভাল আছি।
- শোনো, তাহলে আমরা ইন্ডিয়াতে ড. শেঠির কাছেই যাবো। মাউন্ট এলিজাভেদে অত্যাধিক খরচ, এবার আর যাবো না। শেঠিকে দেখিয়ে তারপর নৈনিতাল ঘুরে আসবো। তোমার মনে আছে? আমাদের বিয়ের তৃতীয় বছরে, তখনো মোনালি হয়নি, তুমি আমাকে নৈনিতাল নিয়ে গিয়েছিলে। কি দারুন সুন্দর! আমি কিন্তু তোমাকে তখন পরাণ বলে ডাকতাম, মোনালির বাবা।
- হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? তুমি সেবছর ইউনিভার্সিটি শেষ করলে। আমি অফিস শেষ করে মাঝে মাঝে তোমাকে ইকলাস সাহেবের বাংলা মোটরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে রিক্সায় করে আমরা আমাদের গোপিবাগের বাসায় ফিরতাম।
- ইলাদের বাংলামোটরের দোতলা বাগান বাড়িটা কি সুন্দর ছিল! অথচ এখন কি একটা শ্রীহীন হাইরাইজ এ্যাপার্টমেন্ট।
- হ্যাঁ, ইকলাস সাহেব যতদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন ছিল। ওরা সবাই তো আমেরিকা চলে গেল। দেখাশুনা করার জন্য তো লোক লাগে।
- কেমন করে আমাদের প্রথম জীবনের ঢাকা বদলে গেলো চোখের সামনে। বিশ্বাস হয়না! তাই না?
- তোমার ওখানে কেমন লাগছে এখন?
- এদের জীবন তো তুমি দেখেছো। সবাই ব্যস্ত। নির্ভানাকে নিয়েই সময় কাটাই। ও আমি কখনো টেলিফোন বা কম্পিউটারে বসলেই কাঁদতে শুরু করে। আপু সোনামনিটা, আমার এতো ন্যাওটা হয়েছে! আমি ফিরে গেলে মোনালি কিভাবে যে ওকে ডে কেয়ারে এ্যাডজাস্ট করাবে আল্লাহ জানে। আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
- ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চা মানুষ তো, কদিন গেলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। তুমি সময় পেলে কি করো? টিভি দেখো?
- নাহ। এদের এখানে তো বাংলা চ্যানেল এখনো নেই। এই নেইবারহুডে বাঙ্গালী তেমন নেই। তাই পে চ্যানেল হিসেবে নিতে গেলে অনেক খরচ বলে ওরা নেয়নি। আর ওদের টিভি দেখার সময় কোথায় বলো? মোনালি আমাকে কম্পিউটারে ইউটিউব বলে একটা জিনিস আছে, ওটা দেখিয়ে দিয়েছে। ওখানে নাটকগুলো দেখি। ঢাকা থেকে দেশ পত্রিকার যে স্বারদীয় পূজা সংখ্যা দুটো এনেছিলাম ওগুলো তো কবেই শেষ।
- হ্যাঁ। আমাদের জন্য ওসব দেশ নয়। এজন্য গেলেও আমার বেশি ভাল লাগে না।
- আমার খুব দিপালির জন্য দুঃশ্চিন্তা হয়। মোনালির আব্বু, তুমি বা আমি জীবনে তো সজ্ঞানে কারো কোন ক্ষতি করিনি। কোন অন্যায় করিনি। তাহলে আমাদের মেয়েটার জীবনে এমন হলো কেন? ওর যে কি হবে? আমার কিন্তু মেহরাব ছেলেটাকে প্রথম থেকেই ওতো ভাল লাগতো না। দিপালির নিজের পছন্দ দেখে তখন আর বাধ সাধিনি। দেখো শেষ মেষ কি পরিনতিটা হলো মেয়েটার।
- হ্যাঁ। মেয়েটার জীবনটা ওলোটপালোট হয়ে গেল। ও ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির সময় কাটাচ্ছে। আমাকে অবশ্য ধরা দেয় না। খুব খাটছে জিআরই পরীক্ষার জন্য। ওর ইচ্ছা এখন আরো পড়াশুনা করার। তুমি চিন্তা করো না, শিক্ষিত মেয়ে, ভাল চাকরি করছে। ভাল ছাত্রী ছিল। ওর ভবিষ্যত ও নিজেই ঠিক করে নিতে পারবে।
- বললেই তো আর চিন্তা থামানো যায় না। মেয়েটার কি হবে ভেবে রাতে আমার ভালভাবে ঘুম হয়না। তুমি তো জীবনে সংসার আর মেয়েদুটো নিয়ে কিছু ভাবলে না। অফিসে ছিলে সিরিয়াস কাজের মানুষ আর বাসায় উদাসী বাবা।
- তুমি ছিলে দেখেই কোনকিছু নিয়ে ভাবতে হয়নি।
- ওগো শোনো। মান্নান ভূঁইয়া সাহেবের কুলখানিতে গিয়েছিলে তুমি?
- গিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট পেয়ে ধুকে ধুকে মারা গেলেন লোকটা। তার চাইতে বড় কথা এতো বড় নেতা অথচ রাজনৈতিক গ্লানি নিয়ে চলে যেতে হলো। দাপট, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা সবই নিঃশেষ হয়ে গেল।
- তুমি অমন বলো না তো। মরিয়ম আপার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। আপা কি ভাল মানুষ! তুমি তো জানো, আপা দুই ছেলেকে রান্না ঘরে পড়িয়ে মানুষ করেছেন। কত কষ্ট করেছেন।
- তুমিতো সবকিছু মরিয়ম আপাকে দিয়ে বিচার করো। এখন উনি গুলশানে থাকেন। এটিই সত্য। নব্বইয়ের আগে আর পরে মান্নান ভূঁইয়া সাহেবের দুই জীবন। ওনার মতো শিক্ষিত পোড় খাওয়া মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিক যদি বিএনপিতে থেকে জামাতীদের সাথে ট্রেড অফ না করতো তাহলে আজ রাজাকারদের এমন রমরমা শক্তিশালী অবস্থা হতে পারে কোনদিন। উনি তো খালেদা জিয়ার ডান হাত ছিলেন, কী করেছেন?
- উনি কিন্তু ওনার ন্যাপ এবং ইউপিপি ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে বিএনপিতে ভেতরে এবং বাইরে জামাতীদের বেশ চাপে ছিলেন।
- ওগুলো বাহাস। বাইরে বাইরে ওরকমটাই মনে হতো। তাহলে বাম দলগুলো এবং আওয়ামীলীগের সাথে পলিটিক্যালি যোগাযোগ রাখতে সুবিধা হয়। ভেতরে ভেতরে সবাই একাট্টা ছিল।
- তা হয়তো হবে। মরিয়ম আপা আমাকে অনেক স্নেহ করেন। আমি আপাকে সহকর্মী হিসেবে কাছ থেকে দেখেছি। উনি দারুন একজন মানুষ। কত গুন ওনার। তুমি আপার সাথে দেখা করতে পেরেছিলে?
- না। কুলখানিতে পুরুষ মহিলা আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল। আর শাহজাহান বলে রেখেছিল ওকে যেন একটু আগে ছেড়ে দেই। ও ওইদিন রাতে ভোলায় ওর বাড়িতে যাবে বলে রেখেছিল। ছুটি নিয়েছিল দুই দিনের। গাড়ি থাকবে না দেখে একটু আগেই বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল মিলাদ শেষ করেই। তাই আর সুযোগ হয়নি।
- দেখি। একদিন আপাকে ফোন করে কথা বলতে হবে।
- হ্যাঁ, কথা বলো। আর তোমার ফ্লাইটের টিকেটটা হলে আমাকে ডিটেইল আইটেনারিটা জানিও।
- আচ্ছা জানাবো। ফোন ছাড়ছি এখন। নির্ভানা ঘুম থেকে উঠে পড়েছে মনে হয়, কাঁদছে। তুমি একটু দিপালির খেয়াল রেখো। ওকে বলো কাল ওর সাথে কথা বলবো। আর তুমি রাত না জেগে ঘুমিয়ে পড়ো।
- ভালো থেকো তোমরা। অরিত্র আর নির্ভানাকে আমার আদর দিও। মোনালিকে বলো আমরা ভাল আছি।
- সাবধানে থেকো। ছাড়ছি, পরাণ।
- আচ্ছা। খোদাহাফেজ, পিংকী।
No comments:
Post a Comment