Wednesday, August 18, 2010

অদ্ভুত আঁধার এক




১.
গরমটা যা জাকিয়ে পড়েছে এবার। বিশ্রি এক অনুভূতি সারাদিন। উফঃ দিনে কোথাও এক দন্ড বসে থাকার উপায় নেই, ঘামে গায়ের কাপড় ভিজে জব জব করে সারাক্ষন। রাত ৯টা। রোকেয়া হল, মেইন বিল্ডিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাতের এই সময়টুকুতে বারান্দার রেলিং এ বসে রুমের ক্যাসেটে জোয়ান বায়েজ ছেড়ে অন্যরুমের সুখদুঃখে আড়ি পাতার মতো এক চিলতে আনন্দ ঢাকার আর কোথাও নেই। এই সময়ে সবাই বাইরে থেকে হলে ফিরতে শুরু করে। কারো চেহারায় থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্নে বুদ হওয়া সুখের স্পষ্ট শিহরণ, কারো চেহারায় থাকে প্রাইভেট টূইশনি করে ফেরা মলিন ক্লান্তি, কেউবা হারানো, প্রাপ্তি ও সংকটের জটিল হিসাব করতে করতে ভ্রু কুচকে বিশ্ববিদ্যালয়, সেশনজ্যাম ও ঢাকা শহরকে তুচ্ছ করে, আবার কেউ নিত্যদিনের হাহাহিহি, ফুচকা, পুরি, সিঙ্গারা সহ আড্ডার ঝিলিক মুখায়বে ফুটিয়ে হলে ফেরে। আমি ঠিক বুঝতে পারিনা আমি কোন দলে সত্যিকারে পড়ি। আমার ধারণা আমি গোত্রহীন আমাদের হলের রেইন ট্রিটার মতো অসাড়তা নিয়ে বেচেঁ আছি। যেন এক একটি ঋতু পাল্টায় আর আমি শুধু পাতার রঙ বদলাই।

আমার নাম অনন্যা রহমান। আমি অর্থনীতি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। ডিবেট করি। সেই যোগ্যতাকে বিবেচনা করে হলের প্রয়োজনে ঢাকায় বাসা থাকা সত্তেও দিব্যি আমাকে হলে একটি সিট দেওয়া হয়েছে। আগে ভারতনাট্যম শিখতাম, অনুষ্ঠানেও নাচতাম, এখন ছেড়ে দিয়েছি। আমি হলে থাকাটা দারুনভাবে উপভোগ করি। আমার রুমমেট মুনমুন এবং সোনালি। ওরা আমার বিভাগের। আমরা ব্যাচমেট এবং বন্ধু। ওদের কারনেই আমার এই মেইন বিল্ডিংয়ে রুম নম্বর এইট্টিতে ওঠা। আরেকটা মেয়ে আছে আমাদের রুমে, নাম অরণি। ফার্মেসিতে পড়ে। মেয়েটা ভাল, কিন্তু ও একটু অন্যরকম। কিংবা হয়তো আমাদের কারণে কোনঠাসা। জীবনকে সুক্ষ ও বিচিত্রভাবে দেখার এবং অপার স্বাধীনতা উপভোগ করার মতো এর চেয়ে চমৎকার ব্যবস্থা আমার বাইশ বছরের জীবনে কোথাও কোনদিন ছিল না। আমার সরকারি চাকুরীজীবি সৎ বাবা-মা তাদের সাধ্যের ভেতর আমাকে কোন কিছু দিতে কার্পণ্য করেননি। একটি মেয়ের মেয়ে ওঠার জন্য পারিপার্শিক প্রতিবেশে যা কিছু প্রয়োজন তারা কোনকিছুর কমতি রাখেননি। আমিও খুব পরিপূর্ন ছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীবন আমার সেই গুডি গার্ল সত্ত্বাকে ওলোটপালোট করে দিল। আগে আমি বেছে বেছে এমন সব উপাদানে আমার জীবনকে সাজাতাম যাতে আমার বাহবা কুড়ানো নিরাপদ জীবনকে ইর্ষা করে মানুষ। কিন্তু এখন আর আমি সেই জীবনে কোন স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। জীবনকে আমার এখন পরীক্ষা করতে ভাল লাগে। হয়তো আমি ভুল, কিংবা আমি জানি না কি ভুল বা সঠিক। কিন্তু আমি পরীক্ষণ করি, অভিজ্ঞতার ঝুড়ি ভরিয়ে তুলছি এবং এটাই আমি চাই। এই কথাগুলো কিন্তু আমি সরাসরি বলতে পারিনা। আমি সবার সাথে মিলে মিশে এমনভাবে থাকি, কাউকে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দেই না। আমার এই হলে থাকা জীবনটা কিন্তু মোটেই সহজ নয়। বিশেষত টয়োলেট এবং বাথরুম – যারা হলে থেকেছে তারা এটা জানেন, হল জীবনের মর্ম হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করেছেন। সেটাও মনে হয় আমার এখন সয়ে গিয়েছে। আমার ছোট বোন রেবুতি এসেছিল কয়েক সপ্তাহ আগে আমার হল জীবন কেমন দেখতে। সবই ঠিকঠাক ছিল কিন্তু ও বাথরুম থেকে ফিরে এসেই অস্থিরভাবে কঠিন স্বরে আমাকে বললো,

– এক্ষুনী ব্যাগ গুছাও। তুমি এখানে থাকতে পারো না।

আমি জানতাম ও এমন কিছুই বলবে। কিন্তু আমি আমার হলে থাকার সিদ্ধান্তে অনড়। ডাইনিং আর টিভি রুমে কি অবস্থা হয়, তা কেউ না দেখলে কোনদিন বুঝবে না। ভাগ্যিস রেবুতি ওদিকটায় যায়নি। অবশ্য ধারণ ক্ষমতার তুলনায় এত বেশি মেয়ে কিছু করারও হয়তো নেই। রেবুতি এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বাসায় আমার ঘরে ফেরা নিয়ে। বাপি-মামনিও হলে ছিলেন ছাত্রাবস্থায়, তাই তারা জানেন এসব। খুব বেশি বিচলিত হননি। কিন্তু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, রেজাল্ট যেন ঠিক থাকে। আমি অবশ্য পড়ালেখার ব্যাপারে বেশ সিনসিয়ার। আসলে আমার ফলাফল কিন্তু স্কুল-কলেজ সবজায়গায় ভাল ছিল। তাই এখন অনেকটা এমনিতেই তাগিদটা এসে পড়ে। আর ফলাফল ভাল করার জন্য খুব যে পড়তে হয়, তাও না। আমি বরং পাঠ্যের বাইরের যে একটা বিকশিত ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশ আছে সেটির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেই। সত্যি কথা বলতে, সেই পরিবেশটা যে খুব বেশি স্বাস্থ্যকর তা কিন্তু নয়। নানা রকম কাঁদা ছোড়াছুড়ি। তবে আমি মেয়ে হিসাবে সবসময় একটা আলাদা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকি। শুধু তাই কেন, বাহূল্য আগ্রহ এবং আমাকে নিয়ে টানাটানির যে একটা ব্যাপার হয় সেটা আমি ভালই বুঝি। এসব নিয়ে প্রথমে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম, এখন ঠিক ঠিক সামলে নিয়েছি। আমি এখন জানি ঠিক কোন সময় নিজেকে সরিয়ে আনতে হয় ঝামেলা ছাড়াই। তবে শিক্ষক এবং ছেলেগুলোও বলিহারি, বাইরে একটা ভালমানুষি মহৎ প্রাণ ইমেজ ঝুলিয়ে রেখে পেটেপেটে এত ছোঁক ছোঁক করা স্বভাব। তবে, সবাই যে এমন তাও নয়। আসলে ভালরাই হয়তো বেশি। কিংবা ভাল-মন্দ মিলেই হয়তো মানুষ। তবে প্রতিষ্ঠিত ইন্টেলিকচুয়ালদের চেয়ে উঠতিরাই বরং ভাল এবং নিরাপদ। একটি ব্যাপার আমি বেশ বুঝে গিয়েছি, আগে অনেককে খুব বড় মাপের মানুষ বলে মনে হতো। এখন জানি এই বড় মানুষগুলোরো কদর্য দিক রয়েছে। প্রথমে মেনে নিতে পারিনি, ধাক্কাটা সামলাতে বেশ সময় নিয়েছি। এখন আর এসব ভেবে খারাপ লাগেনা। হয়তো ডিবেটটা না করলে এই জগতের কথা আমার অজানাই থেকে যেত।

২.
আমি খেয়াল করছি রাজকুমারী গত কয়েকদিন ধরে একা রেলিং ধরে উন্মনা হয়ে দাড়িয়ে থাকে। কখনো কখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে পায়চারি করে। রাজকুমারী থাকে আমাদের দুইরুম পর। আমার রুমমেট সোনালির সাথে বেশ সখ্যতা। মাঝেমাঝে আমাদের রুমে আসে। আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের ছাত্রী। আমরা ওকে রাজকু বলে ডাকি। রাজকু অদ্ভুত এক নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। হয়তো ভরা পূর্নিমার চাঁদটাকে মন ভরে দেখছে। তাই আমি আর ওকে বিরক্ত করিনি। একইভাবে নির্জনে প্রায় ঘন্টাখানেক দাড়িয়ে থাকতে দেখে, আমি যেন পায়চারি করছি এমনভাবে ওর কাছে গেলাম। আমাকে খেয়াল করলো না। চেহারায় কেমন উৎকন্ঠা, দুশ্চিন্তা আর অসহায়তা নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছে। ওর এই অবয়ব দেখে আমার ভেতরে কেমন একটা শীতল অনুভূতি বয়ে গেল। আমি সন্তর্পনে ওর হাতটা ধরতে ও যেন সম্বিত ফিরে পেল,

- ও অনন্যা তুই!
-  কি হয়েছেরে রাজকু?
-  কই? কিছুনারে।
-  না তোকে অনেকক্ষন দেখলাম একইভাবে আছিস। ভাললাম কিছু হয়েছে কিনা।

রাজকু স্মিত একটু হাসলো। সে হাসি একেবারে নৈবত্তিক। সুখ-দুঃখ কিছুই বোঝালো না তাতে। শুধু বললাম – কোন সমস্যা হয়ে থাকলে বলিস আমাকে। রাজকু কোন উত্তর দিল না।
আমি রুমে চলে এলাম। সোনালি বাড়িতে গিয়েছিল। সিলেট থেকে ওর মা আমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছেন। মুনমুন আর আমাকে আগে বলে রেখেছিল, আমরা সেটা দিয়ে রাতে খাবো। সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস রান্না। আমার তেমন ভাল লাগে না, আমি জানি মুনমুনও যে আহামরি পছন্দ করে তেমন নয়। কিন্তু গত সাতমাস ধরে দেখছি, সোনালি বাড়ি গেলে আমাদের জন্য সাতকরার কিছু একটা আনবেই। খাবার এবং গল্পগুজবে আমি রাজকুর কথা ভুলে গেলাম।

৩.
পাচঁ দিন পর। ঠিক ভর দুপুরে। কলাভবনের তিনতলা। আমি ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্যারের রুমের সামনে দাড়িয়ে ইকোনোম্যাট্রিক্স বইটার পাতা উল্টাচ্ছিলাম। আমার হাতে একটা ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেতে তাকিয়ে দেখি রাজকু। আমি বইটি বন্ধ করে ব্যাগে রেখে দিলাম। রাজকুর চুল এলোমেলো। কাপড় অপরিপাটি। চোখের নিচে কালি, চোখটা খুব শুকনো। দেখে মনে হলো হয়তো ঠিকমতো ঘুমায়নি কতকাল। এমন মলিন আমি কোনদিন ওকে দেখিনি।

- তোর একটু সময় হবে?
- একশোবার হবে। কি হয়েছে বলতো রাজকু?

রাজকু কোন কথা বলে না। যেন একটি নিথর মানুষ দাড়িয়ে। কিছুক্ষন স্থির তাকিয়ে থাকে আমার চোখে, তারপর সামনের কোয়াডের সবুজ গাছটার দিকে তাকায় এক দৃষ্টিতে একটু যেন ঋঝু ভঙ্গিতে। আমিও এক মূহুর্ত ওর চোখে তাকিয়ে কি বলবো কথার খেই হারিয়ে ফেলি। একসময় দেখি ওর চোখ গড়িয়ে এক দুফোটা পানিও পড়ে অসচেতনভাবে। সেটা আবার হাতের তেলোয় মুছে নেয়। আমার হাতটি হটাৎ একসময় সয়ংক্রিয়ভাবে রাজকুর কাধে ভরসার পরশ বুলাতে থাকে। হয়তো তাতে কোন কাজ হয়না। করিডোরে অন্য কোন বিভাগের একটি বেঞ্চ পড়ে ছিল। আমি ইশারা করি সেখানে গিয়ে বসার। আমরা বসি। কিংবা সময়ের ভেতর সময় হারিয়ে ‌ফেলি।

৪.
রাজকু আর রাদিনের সম্পর্ক দুবছর গড়ালো। ফার্ষ্ট ইয়ার পেরিয়ে একদিন রাজকু-রাদিন বিহঙ্গ হবার স্বপ্ন দেখে। ওরাও হয়তো খেয়াল করেনি হাতে হাত রেখে রঙ্গীন পেখমমেলা দিনগুলো কিভাবে এগিয়েছে। রাদিনের সাথে আমার ডিবেটের সূত্রে চেনাজানা। রাদিন খুব সপ্রতিভ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভাল ডিবেটর। পড়াশুনা জানাও বেশ, আর কি তীক্ষ্ণ যুক্তিখন্ডন করে! আমার বিশ্বাস রাদিন একদিন ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির কেউ একজন হবে। রাদিনের আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের একজন শিক্ষক হয়ে যাওয়াও অসম্ভব কিছুনা। কিংবা একজন ক্যারিয়ার ডিপ্পোম্যাট। রাজশাহীর কলেজ অধ্যাপক বাবা-মায়ের প্রাণের টুকরো রাজকুর জন্যে বসন্তের আলো ঝলমল দিনের মতো একটি ভবিষ্যত আমি দিব্য চোখে এঁকে রেখেছিলাম। হয়তো তেমনটাই হবে। কিংবা মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। জীবন কখনো এসে গতিপথ পাল্টায়। কিংবা থমকে দাড়ায় মূহুর্তের জন্য। তাতে আমরা কখনোবা খানিকটা সংশয়বাদী হয়ে পড়ি। রাজকুর শরীরে একটি ছোট্ট ভ্রুণ তীর তীর করে বেড়ে উঠছে। একটি জীবনের আভাস। হতে পারতো ওর জীবনের সবথেকে আনন্দের। সেই অনাগত জীবন এখন একটি বিভীষিকা রাজকুর অস্তিত্ত্বে। আমি রাদিনকে ফোন করি, দেখা করবো বলে। রাদিন গুলশানে, লিভার ব্রাদার্সের অফিসে আন্তঃ বিভাগ রম্য বিতর্ক প্রতিযোগিতা “সখী ভালবাসা কারে কয় …” এর জন্য ফেয়ার এন্ড লাভলির স্পন্সর মিটিংয়ে। আমাকে জানায় সন্ধা সাতটায় মধুর ক্যান্টিনে আসতে।

ঠিক সময়ে আমি যাই মধুতে। সন্ধা তখন লাগো লাগো। একটি ঘোর করা মাদক আলো, দলা দলা ধোয়া আচ্ছন্ন করে রেখেছে সময়টিকে। ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে আযান ভেসে এলো। মধুদার ছেলে ধুপধনু ধরিয়ে পাত্রটি হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে পড়তে তুলসিতলা আর ক্যাশ কর্নারের মধ্যে দৌড়োদৌড়ি করছে। এই সময়টিতে লীগ বা দলের ছেলেরা থাকে না সাধারনত। পশ্চিম কোনার বড় টেবিলটি ছাত্র ইউনিয়নের দখলে। সেই টেবিলে ক্যামেলিয়া কিছু একটা বলছে, মানবেন্দ্র মনোযোগ দিয়ে সেটি শুনছে, সাথে অন্যরাও। পাশের টেবিলটি ফেডারেশনের কয়েকজন গোল হয়ে বসে আলোচনা করছে। তার পাশের টেবিলে দুচারজন সখের কবি লিটল ম্যাগ নিয়ে কথা চালাচ্ছে। আমি জানালার পাশের দুজন বসা যায় এমন আইবিএ-মূখী একটি টেবিলে বসে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিলাম। রাদিন এলো আরো কুড়ি মিনিট পর। ওর সপ্রতিভ হাসিহাসি আপন করে নেওয়া মুখটা আমাকে সেদিন একটুও টানলো না। আমরা বসলাম একত্রে। আমি কোন ভনিতা না করে বললাম,

– রাদিন, রাজকুর এখন কি হবে?
ভূত দেখলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, রাদিন তেমনি ভীষন ভয় পেলো যেন। আমাকে বললো,
- মধুতে নয়, অন্য কোথাও কথা বলি, চল।
- শোন, আমি তোদেরকে সাহায্য করতে চাই। এখানেই ঠিক আছে।

আমি অভয় দিলাম। বুদ্ধিমান ছেলে, কথা না বাড়িয়ে আমাকে হাতেপায়ে ধরলো ওকে বাঁচাবার জন্য। আমার তাচ্ছিল্যের হাসি রাদিনকে বুঝিয়ে দিলো যে বাঁচার প্রশ্নটি এখন সবথেকে বেশি একটি অনাগত ঘুমন্ত জীবনের। অনেক বেশি রাজকুর। ওরা রাদিনের চেয়ে অনেক অনেক দ্বিধান্বিত শরীরী এবং জাগতিক জীবনের বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষনে। আমি হয়তো একটু বোকা। রাদিন কথায় কথায় আমাকে কেমন করে যেন রাজকুর দ্বায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। আমি মেনেও নিলাম। রাদিনের আবেগময় অসহায়ত্তে আমি পরাজিত হলাম। হয়তো একজন মেয়ে বলেই, কিংবা জানিনা নিজেকে রাজকুর জায়গায় দাড় করিয়েছিলাম বার বার, সেই দূর্বলতা থেকে, আমি রাজকুর পাশে দাড়ালাম। পুরো বিষয়টি শুধু আমাদের পাঁচজন মানুষের ভিতরে থাকলো। আমি গসিপ করা একদম পছন্দ করি না। সোনালি এবং মুনমুনকে বলে রেখেছি, এটা যেন আর একটি মানুষও জানতে না পারে। সোনালি আমাকে বার বার বারণ করলো এসবে না জড়াতে। কিন্তু আমি তো ওসব গা বাঁচানো কথা শোনার মতো লক্ষী মেয়েটি নই।

৫.
ক্লিনিকটি মুহম্মদপুরে। নিচতলার প্যাথোলজি বিভাগটি যেন নামকাওয়াস্তে। কেমন শ্যাতশ্যাতে আর বদ্ধ। দেয়ালে পোষ্টারে সাঁটা একটি শিশু গর্ভের ভেতর গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। ডাক্তার তেমন চোখে পড়লো না। এককোনায় একটি ফুলের টবে মৃত একটি গাছ। সেটিতে এখন পানের পিক ফেলা হয়, গোড়ার মাটি লালচে হয়ে আছে। রাজকু আর আমি খুব সকাল সকাল গিয়ে আমাদের এ্যাপোয়েন্টমেন্টের সময় এবং নাম জানিয়ে রিসেপশনের সামনে খালি চেয়ায়ে বসে আছি। আমাদের সামনের চেয়ারে দুজন মধ্যবয়সি মহিলা বসে, একজন বোরকা পরিহিতা। রাজকু আমার হাতটি শক্ত করে ধরে বসে আছে। ওর ওড়নাটি মাথায় জড়িয়ে রাখা। আমি গত এক সপ্তাহ রাজকুর বন্ধু থেকে যেন নিকটতম একজন আত্মীয়। পরম নির্ভরতায় অসহায় রাজকু আমাকে একটি ভেলার মতো আঁকড়ে ধরে আছে। আমিও কার্পন্য করিনি ভালবাসা দিতে, বুকে জড়িয়ে রেখেছি পাখির ছাঁনার মমতায়। আজ আমারো একটু ভয় ভয় করছে। কি এমন বয়স আমাদের। একজন নার্স বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। হাতে একটি ক্লিপ বোর্ড। ডাকলেন,

- ফারিয়া আফজাল।
- এই যে, আমরা …
-  আসেন আমার সাথে …

রাজকুর ভাল নাম ফারিয়া আফজাল। আমার চোখের দিকে তাকালো রাজকু। ওকে ভীত উদভ্রান্ত কবুতরের মতো মনে হলো। আমি ওর ধরে থাকা হাতে আলতো করে চাপ দিলাম।

- পেশেন্ট কে?
- এইযে, ও পেশেন্ট।
- হাসবেন্ড কোথায়?
- হাসবেন্ড আসেনি। আমি ওর বড় বোন।

ঢাকা শহরে যারা এমআর করায় তারা এসবে সিদ্ধ। সবই জানেন। নার্সটির তীর্যক প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি পড়ে নিতে কাফকা কিংবা কোয়েলো পড়া জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। আমি তাকে একটু সাইডে নিয়ে আলাদা করে একটি হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে সকল প্রশ্নের ইতি টেনে দিলাম।

আমাদের সেই দিনটি ক্লিনিকে থাকতে হলো। খুব গা ঘিনঘিন করা পরিবেশে একটি রাত। পরিবেশের চেয়ে আমার কাছে নিরাপত্তার প্রশ্নটি খুব বেশি করে মনে হলো। অন্য ক্লিনিক থেকে একদম অন্যরকম। মুনমুন এলো খাবার নিয়ে দুপুরে। দুপুর এবং রাতের খাবার একসাথে পুরোনো আইসক্রিমের বাক্সে করে। বিকালে ও হলে ফিরে গেলো। সোনালি আসেনি। প্রথম থেকেই আমার সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করে আসছিল। রাদিন ফোন করে খোঁজ নিল বেশ কবার। অপরাধবোধে ওর নাকি সামনে আসতে ভীষণ সংকোচ হচ্ছে। ওর খরচাপাতি মেটাবার প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে দিলাম। পরদিন দুপুর নাগাদ রাজকুকে নিয়ে আমি হলে ফিরে এলাম। হলে একটি দিন থেকে রাজকু ওর এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেল। তার দুদিন পর রাজশাহীতে।

৬.
সোনালি, মুনমুন এবং আমি গিয়েছি জগন্নাত হলে বিজয়ার দিন দুপুরে। তারপর পুরোনো ঢাকা ঘুরে হলে ফিরে দেখি রাজকু ফিরেছে হলে। একমাস পর। কি যে মায়াবতী চেহারা হয়েছে ওর। ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্যটাও যেন একটু উন্নত হয়েছে। ও হয়তো মা হলে সবকিছু দারুন পরিপূর্নতা পেতো। রাদিন আমাকে অনেক কাকুতিমিনুতি করেছে আমি যেন ওর ইউনিভার্সিটির ক্যারিয়ার ধবংস করে না দেই। কথা দিতে হবে, কাউকে যেন না বলি। আমার খুব রাগ হলেও ক্ষমা করে দিয়েছি। এক মাস পর রাজকু মেইন বিল্ডিং থেকে রোকেয়া হলের এক্সটেইনশনে ওর রুম পাল্টে নিয়েছে। যা অনিবার্যভাবে হবার কথা ছিল তাই হলো। আনুষ্ঠানিকতার কোন প্রয়োজন ছিলনা। তবু আমরা একদিন জানলাম রাদিন-রাজকুর পথ এখন আলাদা। ধীরে ধীরে রাদিন এবং রাজকু এক রকম আমার জীবন থেকেও দূরে চলে যেতে থাকলো। পরীক্ষা এবং ডিবেট নিয়ে আমি ডুবে থাকলাম। একদিন বাসার চাপাচাপিতে হল জীবনের ইতি টেনে পাকাপাকি আমাদের সোবহানবাগের বাসায় চলে গেলাম। মুনমুন, সোনালি এবং আমার নতুন সব এ্যাডভেনচার আবার একইভাবে চললো। রাদিনের সাথে দেখা হলে এরপর থেকে খানিকটা যেন লেজনাড়া একটি কুকুরের মতো আচরণ করতো। হয়তো ভয়ে কিংবা দ্বিধা সংকোচের অস্বস্তিতে। আমি কথা রেখেছি, কাউকে কিছু বলিনি। রাজকু যেন অনেক দূরের কোন দেশের বাসিন্দা হয়ে গেল ধীরে ধীরে। প্রথমে খেয়াল করিনি, একদিন সোনালি ধরিয়ে দিল যে রাজকু আমাদের এড়িয়ে চলে সচেতনভাবে। একদিন আবিষ্কার করলাম রাজকু যেন আর আমাকে চেনেনা। হয়তো আমরা কোনদিন বন্ধু ছিলাম না। পরিচয় হয়নি। হয়তো এটিই নিয়ম। হয়তো জীবনের এই রীতি আমি জানতাম না। শিখে নিলাম।

৭.
পনেরো বছর পর। আমার অনেক কিছু হবার কথা ছিল জীবনে। আমি হয়েছি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার উপ-সম্পাদিকা। একটি নাট্যদলের সাথেও জড়িত রয়েছি। আমি মূলতঃ স্ক্রীপ্ট লিখি আর পর্দার পিছনে বেশি কাজ করি। আমি যে ছেলেটিকে ভালবাসতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার সাথে আমার মতের অমিল প্রকট আকারে বেরিয়ে আসে লেখাপড়ার পর্ব চুকানোর পর। জীবনের প্রতি নির্লিপ্ততায় আমি আর উচ্চতর শিক্ষার পথে পা বাড়াইনি। মামনি বেশ কজন সুপাত্র ধরে এনেছিলেন আমার জন্য। আমাকে তাদের ভালও লেগেছিল। কোন এক উন্নাসিকতায় সেসব বিয়ের প্রস্তাব ভেস্তে যায়। বাঙ্গালি জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনটি একদিন আমিও করে ফেলি, বিয়ে করি একজন প্রকাশককে। আমাদের সন্তান এখন নালন্দা বিদ্যালয়ে যায়। রাদিন শেষপর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়, শিকাগো থেকে পিএইচডি করেছে। তারপর ইয়েল থেকে পোষ্টডক করে এখন ইউনিভাসিটি অব সাউথ ডাকোটার রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের কন্ট্রাক্ট প্রফেসর। হয়তো খুব শীঘ্রি কোথাও টেনিউর ট্র্যাক পজিশন পেয়ে যাবে। রাজকুর সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। এখনো নেই। গতবছর ঢাকায় অফিসার্স ক্লাবের এক বিয়েতে আকষ্মিক আমাদের দেখা হয়। অস্বস্তি কাটিয়ে সৌজন্য কথার সময় জানতে পারি রাজকু এখন জেনেভাতে থাকে, স্বামী ডব্লিউটিওতে উচ্চপদস্থ ফাইনানশিয়াল এনালিস্ট। সোনালির জীবন সবার চেয়ে স্বাভাবিক। ও সত্যিকারে মধ্যবিত্ত ঢাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্বামী ব্যাংকার, নিজে কলেজ অধ্যাপিকা। ছুটিতে নিয়ম করে কক্সবাজার বেড়াতে যায়। অবশ্য গতবছর নেপাল এবং এবছর ভারতে বেড়াতে গিয়েছিল। তবে, একটি সন্তানের জন্য এখনো খুব হাপিত্যেশ করে। মুনমুনের মাষ্টার্সে থাকতে বিয়ে হয় বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক শিক্ষকের সাথে প্রেম করে। টেকেনি। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে ট্র্যাক পাল্টে এখন কেমব্রিজের কিংস কলেজে শান্তি এবং সংঘর্ষ বিদ্যায় পিএইচডি করছে। আমরা তিনজন এখনো সুযোগ পেলে একসাথে হই। প্রবর্তনার আড্ডায় গিয়ে হই হই করি। আমরা এখন আর রাজকুর এ্যাবোরশন নিয়ে কথা কাটাকাটি করি না, করি আমেরিকার এ্যাবোরশন পলিসি নিয়ে। গাঁজা নিয়ে। দান্তেওয়ারে নিয়ে। পার্বত্য চট্টগাম নিয়ে। ফুলবাড়ী নিয়ে। সুপ্রিম কোর্টের নারী নিপীড়ন বিরোধী রায় নিয়ে। কিংবা সিমিদের আত্মহত্যা নিয়ে।


*** *** ***
১. শিরোনামটি জীবনানন্দ দাসের কবিতা থেকে ধার নেওয়া। কয়েক দফা উপযুক্ত নাম নিয়ে ঘষামাঁজা করে যখন কিছুই মনোঃপুত হচ্ছিল না, তখন এই নামটি বসিয়ে স্থিত হই।
২. ছবি: সালভাতোরে ফিউম।

শিরোনামহীন কথোপকথন – দুই





-  হ্যালু, ক্যা ফুন করছেন?
-  হ্যালো, সিরাজ ভাই আমি নাসিমা, ঢাকা থেইকা …
-   কিরে নাসিমা? আসোস কেমন? তর ফুন না পাইয়া আমি এইদিকে চিন্তায় পইড়া  গেচিলাম।
- বালা আছি। আফনের খবর কি হেইডা কন?
-  আমি তো সবসময় ভালাই থাক্কি। তয়, দুকানের কামডা ছাইড়া দিসি।
-  হায়! হায়! কন কি?
-  হ, ওহন বইয়া বইয়া রিটারমিন খাইতাছি। হেঃ হেঃ হেঃ
-  আরিকটা কাম পাইছেন নাকি মালিকে খেদাইয়া দিসে?
-   হুন, তর সিরাজ ভাইরে খেদানোর ক্ষেমতা এই দোন্যাই কেরুর নাই…
-   হ, হ, বুচ্চি … আফনেরে আমার চিনা আছে… আফনের মতো আকাইম্যা ব্যাডা আমি দুইডা দেহিনাই।
-   তর এই কথার লাইগা তরে যে আমার কি করতে ইচ্চা করে …
-   এই হুনেন, দুকান থেইকা ফূন করছি, ওহন রঙঢঙের কতা কয়োনের টাইম নাই। আফনে ঢাকা আইবেন কিনা হেইডা কন?
-   ওহন ঢাকায় আমু কেমনে?! আমার কত কাইমকাইজ আছে জানোস?
-   আফনের তো চাকরিই নাই। কিয়ের কাম আফনের? হুনেন, আমাগো খালু জাপান যাইবো দুই মাসের লাইগা। খালাম্মা এট্টা নিজোগো চিন-পরিচয় ব্যাডা খুঁজতাছে বাসায় থাহনের লাইগা। আমি আফনের কতা কইছি।
-   আমার কথা কি কইচোত?
-   কইছি, আফনে আমার বড় কাকার পুলা … হিঃ হিঃ হিঃ
-   তুইতো দেহি ম্যালা চালাক হইয়া গ্যাচোস ঢাকা থাইক্কা! হুন, আমি এট্টু ভাইবা দেহি আর এদিকের কাইমকাইজ সাইজ দিয়া লই।
-   হুনেন, আফনে তো এককান আকামের ঢেকি। ঢাকা আয়োনের একটা ব্যবস্থা হইছে, এইডা কিন্তু আর পাইবেন না। একবার আইলে তখন আরেট্টা কাম জুইট্টা যাইবো। না আইয়া শিবালয়ে বইয়া থাকলে চাকরি কেউ আফনেরে গালে তুইলা দিবো নাকি?
-  মাইয়্যা মানুষ সবসময় এট্টা ফ্যাসিলিটির মইদ্যে ফালাইয়া দ্যায় … হুন…
-   কি হুনুম? আফনের অইলো প্যাটে ক্ষিদা আর মুক্কে লাজ; মেনিমুইখ্যা বরকন্দাজ কুনহানকার… আমারে আর পাইবেন না কইলাম… বুচ্চেন?
-    যা কতা হিকচোছ না! হুন, তর খালু যাইবো কবে?
-   সিপটিম্মরে যাইবো, ওহন তো আগুষ্ট মাস, এ্যার পরের মাসে। খালু যাওনের আগ দিয়া আফনের আইতে হইবো কইলাম।
-   আইচ্চা তাইলে তর খালাম্মারে আমার কথা ফাইন্নাল কইয়া দে।
-   আমি খালাম্মারে কওনের পর কিন্তু মুড়ামুড়ি কর্তে পারবেন না, পাক্কা কথা কন ওহনি।
-    ক্যা? আমার কতা তর কানে ঢুকতাছে না, নাকি? কি কইলাম তরে?
-  চ্যাতেন কিয়ের লাইগ্যা?
-   এ্যা? চেতুম না, উনারে ধইরা সুহাগ করুম! হুন, তর খালুর লগে আমারে ফুনে ধরায় দেস।
-    খালু লাগবো না। খালাম্মাই কেস ফাইনাল। এ্যাগো বাসায় মাগী মোড়ল মিনসে গাড়ল, বুচ্চেন? … আমার আর আফনের লাহান… হিঃ হিঃ হিঃ
-     তরে ওহন সামনে পাইলে থাপড়িয়া তর দাঁত ফালিয়ে দিতাম।
[হিঃ হিঃ হিঃ ... ... ]
-  হুনেন, হুদাই এতো ভাব নিয়েননা। পাটুরিয়ার মন্নান ভাই আমার খুঁজখবর নিয়া যায় রিগুলার। হেই সিয়েনজি চালায়তাছে ঢাকায়। বুচ্চেন? আফনের তো কুনো কামের মুরোদ নাই। নাসিমা এতো সস্তা না! দাম আছে।
- মন্নানের লগে যাবি তো যা। তরে কি আমি বাইন্দা রাখছি?
-  মন্নান ভাইর কতা কইচি আর ছ্যাত কইরা জ্বইল্লা উঠছে, না? ওই মিয়া বুজেন না, আপনেরে ঢাকায় ক্যান আইতে কই? হেইডা কিয়ের লাইগা? যত্তসব।
-  হ, ওহন আর ভুজুংভাজুং মারন লাগবো না। তর যে অদপতন হইতাছে, দিনদিন এট্টা খ্রাপ মাইয়া হইয়া যাইতাছোস।
-   হ, আমি তো খ্রাপ মাইয়া। খ্রাপ মাইয়ার লগে দুই দিন কতা না কইলে আবার আফনের ঘুম অয়না। সিরাজ ভাই হুনেন, মায় কইলো মোমেনা নাকি বাপের বাড়িত ওহন … আপনের লগে দেখা হয়নাই? হিঃ হিঃ হিঃ
-  না, হয়নাই। অয় বাপের বাড়ি আইলে আমার কি?
-  ক্যান? অয় না আপনের পুরানু দিল্লাগি! অয় তো আপনেরে অনেক চাইতো … হিঃ হিঃ হিঃ
-  একটা চটকানি দিমু তরে ধইরা।
- এইযে হুনেন, আমি ওহন ফুন রাখুম। সাত মিনিট হইছে।
-  আপনে খালাম্মার ফুনে ফুন দিয়েন। রিজিয়া বুরে দিয়া করাইয়েন। ডাইরেট কইরেন না কইলাম। খালাম্মায় ব্যাটা মানুষ চাইলে দিবার চায় না। মিজাজ দ্যাখায় পরে।
-  আইচ্চা, করুমনে। তুই বালা থাকিছ। হুন, তর লাইগা লাল চুঁড়ি কিইন্না রাখছি। আহনের হময় আনুমনে।
-   করচেন কি? আফনের পকেড তো এমনিতেই ফুডা, আবার আমার লাইগা কিনচেন? আইচ্চা হুনেন, আমি খালাম্মার কাচ থেইকা কুনফাম হইয়া আপনেরে পাক্কা জানামুনে।
-  হ, ঠিকাসে, জানাইস। কতা হইবোরে নাসিমা। ভালা থাহিছ আর মন দিয়া কাইমকাইজ করিস।
-   আইচ্চা, আফনেও ভালা থাইক্কেন। সিলামালিকুম।
-    হ…।


ছবি: জিওফ্রে হিলার, ২০০৯

শিরোনামহীন কথোপকথন – এক



- হ্যালো …
: হ্যালো, আমি।
- কি ব্যাপার? এত রাতে? তোমার ওখানে তো এখন শেষ রাত।
: ঘুম আসছিল না তাই। নির্ঘুম রাতগুলো এত কষ্টের হয়, কাউকে বুঝাতে পারবো না। তুমি ব্যস্ত নাতো?
- নাহ! এ্যা ওয়াক ইন দ্য ক্লাউডস দেখছিলাম। আজ তো সানডে।
: হটাৎ এতো পুরোনো মুভি?
- এমনি। পেলাম তাই দেখছিলাম।
: আমার ফোনটা তাহলে ঠিক সময়ে করা হয়নি। ডিস্টার্ব করলাম?
- আমি বলেছি তাই?
: নিউইয়র্ক যাওয়া হচ্ছে?
- হ্যাঁ।
: দারুন! হিংসায় জ্বলে পুড়ে গেলাম। কি আর করা! কতদিনের জন্য যাচ্ছো?
- থার্ড অগাষ্ট ফিরবো।
- তুমি কবে ফিরে যাচ্ছো?
:  একই দিন। থার্ড অগাষ্ট।
: শোনো …
- কি?
: আমার একদমই যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে একটা জেলে আবার ফিরে যাচ্ছি।
- পোর্ট অব এন্ট্রি কোথায়?
: হিউস্টন। হিউস্টন হয়ে হান্টসভিল কাছে হয়। তোমার থেকে অনেক দূরে।
- কঠিন দিনগুলো তো পার করে ফেলেছো। আর একটা বছর খুব দ্রুত চলে যাবে, দেখো।
: আসবে হান্টসভিলে?
- আসবো তো বলেছি…
: কবে?
- দেখি কবে আসা যায় …
: উমম … এবার হবেনা, না? এটা হয়তো আমরা দুজনই জানি হয়তো কখনোই হবে না।
- তাই? আমার তেমনটা মনে হয় না।
: আমার যা মনে হয় তাই আমি বলেছি …
- আমি আসবো।
: জানিনা, হয়তো আসবে …
- বাসা ঠিক করতে পেরেছো?
: হুঁ, পারলাম কোনরকমে। এবার একেবারে নিজের বাসা। ছোট, কিন্তু আমি খুশী কারণ আই ওন্ট হ্যাভ টু শেয়ার রুমস উইথ এ্যা শ্যাভ এ্যনিমোর। ছবিতে দেখলাম, সুন্দর একটা পোর্চ আছে। বসে আয়েশ করে চা খেতে পারবো নিজের মতো করে।
- বাহ, তাহলে তো বেশ ভাল।
: মন ভাল নেই, বুঝলে। শরীরটা বেশ খারাপ যাচ্ছে গত দুদিন ধরে। সার্জারিটা ঢাকা থেকে করাতে পারলে ভাল হতো। হলো না। সময় নেই। দুশ্চিন্তা হচ্ছে, একা একা যদি হাসপাতালের ঝক্কি সামলাতে হয় মরার হান্টসভিলে।
- অযথা চিন্তা করো না। কিচ্ছু হবে না। তুমি ভাল থাকবে।
: নিজের উপর ভরসা হয়না। ইনফ্যাক্ট, কোন কিছুতেই হয় না।
- আর এবার ফিরে গিয়ে পাগলামিটা একটু কম করে করো।
: কম কি করে করবো, শুনি? আমার পুরো ফ্যামিলির ক্রনিক পাগলামির রোগ আছে।
- হাঃ হাঃ হাঃ … খুবই খাঁটি কথা।
: শোনো পৌছে একটা মেইল করে দিও। তোমার জন্য কিন্তু মানুষ চিন্তা করে।
- হ্যাঁ, জানি। আসলে একদম খেয়াল থাকে না। মেইল পাবে।
- মন ভাল হলো?
: কিছুটা বোধহয়। নিশ্চিত না। আচ্ছা, আমি ছাড়ছি এখন। হান্টসভিল থেকে কথা বলবো। নিজের খেয়াল রেখো।
- ঠিক আছে। পরে কথা হবে। ভাল থেকো।
: তুমিও। নাইট, নাইট।
- নাইট।

*** *** ***
ছবি: সালভাতোরে ফিউম

পুষ্প, বিহঙ্গ এবং বসন্তদিন

ক’দিন থেকেই মন ও তার কারখানার যাচ্ছেতাই অবস্থা। কিছুই ভাল লাগে না। সেমিষ্টার শেষ হইয়াও হইল না শেষ – ধরনের একটা অবস্থায় ঝুলছে। স্কুলে এখন সেমিষ্টার ফাইনাল। গমগম করা ল্যোব বিল্ডিং, ইউনিসেন্টার, অট্রিয়াম অনেকটাই ফাঁকা গড়ের মাঠ। টিমহর্টনস কিংবা ষ্টারবাকস কফিশপে লম্বা সেই একপ্রস্থ লাইন আর নেই। ফিল্ড হাউস, অ্যালামনাই হলসহ যেসব জায়গায় পরীক্ষা চলে, সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে চিন্তাক্লিষ্ট মুখ। কেউ কেউ নোটে বা বইয়ে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে শেষবারের মতো। যাদের পরীক্ষা শেষ তারা ইয়ার এন্ড (একাডেমিক) পার্টি করে বাস স্ট্যান্ড নয়তো এয়ারপোর্টে ছুটছে। যারা সামার করবে তারা নিরুপায়। আমার এই শহরেই থাকতে হচ্ছে। অগত্যা বন্ধুদের একে একে বিদায় দিচ্ছি।

এখন আবহাওয়া বেশ ভালোর দিকে। বরফ নেই, মাঝে মাঝেই চিক্‌চিক্‌ করা সোনা রোদে সকাল জানান দেয় আমার জানালা দিয়ে। আবার দুই একদিন আকাশ গোমড়া মুখ করে থাকে। বৃষ্টি হয় ঝিরঝির। অফিসিয়ালি এখন বসন্ত। উত্তরের এই খোট্টার দেশে যারা পড়ে আছে তাদের জন্য এই সময়টা অনেক বর্ণিল। আমার ঘরের সাথে লাগোয়া ডেকটায় চেয়ার পাতা আছে দুটো, রোদেলা উষ্ণ দিনে সেখানে বসে ধোয়া ওঠা কাপে চুমুক দেই আলস্যে। বাড়ীর পাশের ম্যাপল গাছটায় কচিকচি পাতা জেগে উঠছে। হরেক গাছে নতুন পাতা আর ফুল আসতে শুরু করেছে। এতদিন বরফে ঢেকে থাকা বর্ণহীন ঘাসগুলো সবুজ স্বাস্থ্যবতী অপরূপা হয়ে উঠছে। পার্কে, রাস্তার পাশে, লেকের ধারে টিউলিপের চারা মাথা উচিয়ে পৃথিবীর রূপ রঙ দেখা শুরু করেছে। রঙ-বেরঙের কত যে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। নাম না জানা নানা জাতের পাখি আবার শহরের বুকে গ্রীষ্মের উষ্ণতা উপভোগ করতে ফিরে আসছে। সেইসব পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে বিকেলটাকে ছোটবেলার খেলার মাঠের মিষ্টি কোলাহল বলে মনে হয়। ভারি মিষ্টি ও প্রাণ জুড়ানো তাদের ডাক। তাপমাত্রা এখন অনুকূলে তাই অনেক মানুষ এখন রাস্তায় হাঁটতে বের হয়। এক দঙ্গল মানুষ মে মাসের ম্যারাথন আর ক্রস কান্ট্রিতে দৌড়াবে তাই তুমুল উৎসাহে শহরময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়া ইয়োগা, ফিটনেস ডান্স, বাইকিং এসব তো আছেই। রেস্তোরাগুলো তাদের আউটডোর টেবিল লাগিয়ে দিয়েছে। সেখানেও অনেক লোক সমাগম হয়। খাবার, পানীয়, গান-বাজনা – বেশ উৎসবময় পরিবেশ।
সকালে স্কুলে যাবার সময় প্রতিদিন দেখি প্রতিবেশী মিসেস নিকোলীনা চেয়ারে সানগ্লাস চোখে তার টেরাসে বসে থাকেন। নানা ছুতোয় কথা বলতে চায় বৃদ্ধা। বেশিরভাগ দিন ট্রেন মিস হবে বলে কেটে পড়ি, দু’এক দিন ভদ্রতা করে দাঁড়াতে হয়। যেদিন বাসায় বসে পেপারের কাজ করি, কখনো কখনো খুব অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি। কিছুতেই মন স্থির থাকতে চায় না এই কাঠের বাক্সের চারদেয়ালের ভিতর। গত সপ্তাহে তেমনই এক বিকালে কুইন এলিজাবেত ড্রাইভ‌‌ওয়ে বরাবর ডাউজ লেকে হাঁটতে চলে গেলাম। কথা আর না বাড়িয়ে সেখানে কি দেখলাম সেই ছবিতে চলে যাই।


পুষ্প কথা - এক
পুষ্প কথা - এক

পুষ্পকথা - দুই
পুষ্পকথা - দুই

পুষ্পকথা - চার
পুষ্পকথা - চার

পুষ্পকথা - চার
পুষ্পকথা - চার

পুষ্পকথা - পাঁচ
পুষ্পকথা - পাঁচ

পুষ্পকথা - ছয়
পুষ্পকথা - ছয়

পুষ্পকথা - সাত
পুষ্পকথা - সাত

বিহঙ্গকথা - পাখি উড়িয়া উড়িয়া ... উড়িয়া যায়
বিহঙ্গকথা - পাখি উড়িয়া উড়িয়া ... উড়িয়া যায়

বিহঙ্গকথা - নীল আকাশের বুকে উড়ন্ত সুখ...
বিহঙ্গকথা - নীল আকাশের বুকে উড়ন্ত সুখ...

বিহঙ্গকথা - ডাউজ লেক থেকে অন্ন সংগ্রহ
বিহঙ্গকথা - ডাউজ লেক থেকে অন্ন সংগ্রহ

বিহঙ্গকথা - উড়ে যায় বকপক্ষী...
বিহঙ্গকথা - উড়ে যায় বকপক্ষী...

বৃক্ষ - আবারো জেগে ওঠা
বৃক্ষ - আবারো জেগে ওঠা

বৃক্ষ - পুষ্পপত্র চেয়ে থাকে আকাশের পানে
বৃক্ষ - পুষ্পপত্র চেয়ে থাকে আকাশের পানে

বৃক্ষ - সবুজ আলোর ছটা
বৃক্ষ - সবুজ আলোর ছটা

ডাউজলেক - নিসর্গে ভ্রমন
ডাউজলেক - নিসর্গে ভ্রমন

দৌড় - ম্যারাথন কিংবা ক্রস কান্ট্রি
দৌড় - ম্যারাথন কিংবা ক্রস কান্ট্রি

যুগল ও বিহঙ্গ - কি কথা তাহার সাথে
যুগল ও বিহঙ্গ - কি কথা তাহার সাথে

শাখাপ্রশাখা
শাখাপ্রশাখা

বেলা শেষের আগে
বেলা শেষের আগে

যা শুনলাম, যা বুঝলাম

লজ্জাহীন ব্যস্ত তথা লজ্জা ঢাকিতে


গতকাল সকালে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠলাম। ব্রাজিল আর পর্তুগালের খেলা মিস করা যাবে না। তড়িঘড়ি করে কিচেনে টোষ্ট আর চা রেডি করছি। রুমমেট চার্লি হটাৎ জিজ্ঞাসা করলো, টরন্টো যাচ্ছো নাকি? মনে মনে বললাম, সকাল সকাল মাথা নষ্ট নাকি? তারপর খেয়াল হলো, জি-৮ / জি-২০ সামিট। এইটা নিয়ে স্টুডেন্ট ইউনিয়নে বেশ শোরগোল কদিন থেকে। অনেকেই অটোয়া থেকে সামিট প্রটেস্ট করতে টরন্টোমুখী। অনলাইনে স্টুডেন্টস এগেইনষ্ট জি-৮ সামিটের সিগনেচার ক্যাম্পেইন ফর্ম পাঠিয়েছিল, দায়সারাভাবে ফিলআপ করে দিয়েছি। ব্যস, এটুকুই। আমি বললাম, নাহ, যাচ্ছি না। চার্লিও যাচ্ছে না, কিন্তু ওর ইচ্ছা ছিল। তারপর সামিটের পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে ‌একদফা বেশ আলোচনা চললো কানাডার সরকার কিভাবে ট্যাক্সের পয়সা খরচা করে এদেশের নাগরিকদের অধিকার খর্ব করছে। মানে, টরন্টো কিভাবে একটা সুপার পোলিসিং সিটিতে রুপান্তরিত হয়ে আকষ্মিকভাবে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রতিহত করছে। মিলিয়ন ডলার খরচ করছে সম্মেলনের চারপাশের সিকিউরিটির জন্য মানে বেড়া দেওয়া আর কয়েক হাত পরপর পুলিশ দাঁড় করিয়ে রেখে। অন্টারিও প্রোভিন্সে পুলিশকে সাময়িকভাবে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সামিটের নিরাপত্তা বেড়ার আশপাশে কাউকে পরিচয়পত্র ছাড়া পাওয়া গেলে তৎক্ষনাত গ্রেফতার করার। এবং সেই আইনে গ্রেফতার করাও হয়েছে। বেশি ক্ষমতা পেলে অপব্যবহারও বেশি হয়, এখানেও তাই হচ্ছে সাধারন প্রতিবাদকারীকে সন্ত্রাসী হিসাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করা যে অধিকার, এবং প্রতিবাদ করলেই যে কেউ সন্ত্রাসী নয় পুলিশের আচরণে এই পার্থক্য উপেক্ষা করা হচ্ছে। ৮৫ বছর বয়ক্স এক হুইলচেয়ারে বসা প্রতিবাদকারীকে সন্ত্রাসী উল্লেখ করায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে। তাই বলে প্রতিবাদ থেমে নেই। এখানকার পুলিশের দূর্ভাগ্য যে এখানে গ্রেফতার বানিজ্য নেই, নইলে কিন্তু এই ‌‌ওছিলায় ভালোই আয় রোজগার হতো। যাইহোক, পুরো ব্যাপারটাই হলো মিলিয়ন ডলার শো ডাউন। চার্লির সাথে আলাপ আরো কিছুক্ষন চলতো, কিন্তু ব্রাজিল-পর্তুগাল ম্যাচ শুরু হয়ে যাচ্ছিল তাই ইতি টানা হলো। তখনই মনে পড়লো, গতবছর আমি যখন কোর্স সিলেকশনের সময় পলিটিক্যাল ইকোনমি কোর্স বেশি নিয়েছিলাম, চার্লি আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল যে এজাতীয় কোর্স কিভাবে ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে প্রতিযোগী হিসাবে অবস্থান দূর্বল করে দেয়, কারণ পলিটিক্যাল ইকোনোমি সরকারের নীতিকৌশল ও কর্পোরেট বানিজ্য রাজনীতির কৌশলকে সমালোচনা ও প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সংগত কারনেই এমপ্লোয়ারদের কাছে পলিটিক্যাল ইকোনোমি ব্যাকগ্রাউন্ড কম প্রত্যাশিত তাই চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যায়।
.
জি-৮ অনেক বড়ো ব্যাপার। আমি বড় ব্যাপার স্যাপার নিয়ে সাধারনত মাথা ঘামাই না। তাহলে এটা মাথায় ঢুকলো কিভাবে? শুধুমাত্র বন্ধুবান্ধবের কানপড়া, ফেইসবুক আর মিডিয়া থেকে। আমার কয়েকজন বন্ধু আছে যারা বেশ জোরেশোরে এ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট। তারা সামিটের এজেন্ডার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করছে। নিয়মিত ফেইসবুকে আপডেট দিচ্ছে। সেটা দেখতে দেখতেই আমি মোটামুটি নিউজগুলো ফলো করা শুরু করে দিলাম। কাল রাতে আবিষ্কার করলাম আমি আর তোতান মিলে জি-৮ নিয়ে পলাশ ভড়ের সাথে মাঝরাতে অটোয়ার ডাউনটাউনের রাস্তায় গালগল্প করছি। জি-৮ সামিটের নিরাপত্তা জোনের চারপাশ ঘিরে যে বেড়া দেওয়া হয়েছে তাতে রেজারের ব্লেডের মতো ধার, তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। যা তা ব্যাপার নয়, টরোন্টো ডাউনটাউনের মেট্রো টরোন্টো কনভেনশন সেন্টারের চারপাশ জুড়ে ছয় কিলোমিটারব্যাপী তিন মিটার উঁচু এবং ছয় কিলোমিটার লম্বা এই বেড়ার খরচ পড়ছে ৫.৫ মিলিয়ন ডলার। জি-৮এবং জি-২০ সামিট মিলে ইতিহাসের সবথেকে ব্যয়বহুল সামিট হচ্ছে যেটাতে ১ বিলিয়ন ডলারের উপর খরচ করা হচ্ছে। এতো বড়ো পাবলিক ফান্ড বিভিন্ন খরচখরচাবাবদ সরাসরি মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেট সিকিউরিটি/মিলিটারি কোম্পানিগুলোর পকেটোস্থ হচ্ছে বলে সচেতন মানুষজন কানাডার সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করছে। তাই এই সামিটের সিকিউরিটি ওয়ালের নাম দেওয়া হয়েছে কর্পোরেট সিকিউরিটি ওয়াল। আমেরিকার ব্লাক ওয়াটার আর কানাডার এসএলসি লাভালিন নিরাপত্তার ঠিকাদারির বিডে জিতেছিল প্রথমে, সেখান থেকে মন্ট্রিয়ালভিত্তিক এসএলসি লাভালিন নিরাপত্তা ঠিকাদারীটা পায়, যারা কিনা আফগানিস্থানে ন্যাটো বাহিনীর দখলদারিত্ত্বের পরিবেশ সহায়ক করতে অবকাঠামো ও অন্যান্য ঠিকাদারীর কাজ করে। তারা ইরাক যুদ্ধেও একই ব্যবসা করেছে। তার মানে দাড়ায়, এসএলসি লাভালিন ন্যাটো বাহিনীকে সহায়তা করে মূলতঃ আফগানদের সমসাময়িক জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্যাতন, দারিদ্রতা এবং সংঘর্ষ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কানাডার মানুষজনের প্রশ্ন হচ্ছে সরকার দেশের মানুষের পয়সায় নিজের দেশের মানুষের বাক ও নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার মতো ভাড়ামিটা কেন করছে? এই অধিকার সরকারের আছে কিনা? সবশুনে আমি মনে মনে বলি, ব্যাক্কল নাকি?! সরকার বাহাদুর চাইলে সব করতে পারে।
নিরাপত্তা ব্যাপারটা একটা জুজু ছাড়া আর কিছু না। এই জুজুর ভয় দেখিয়ে কত মৃর্ত্যু জায়েজ করা হচ্ছে সমসাময়িক পৃথিবীতে সেই পরিসংখ্যানের কোন রেকর্ড নেই। বিশ্বে তথাকথিত শান্তিশৃঙ্খলা ঠিক আছে কিনা তা নিয়ে জি-৮ দেশের মাথা ব্যথার শেষ নেই। তাই তারা আফগানিস্থান, ইরাক, ইরান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশ নিয়ে চিন্তিত, সেসব জায়গার পরামানু অস্ত্র, সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, সংগঠিত অপরাধ এবং মানব ও মাদক পাচার নিয়ে গলদঘর্ম। মজার ব্যাপার হলো, জি-এইট দেশগুলোর প্রত্যেককেই এই একই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু সেখানেই কবি নীরব! আমাদেরকে শেখানে হয়েছে, ইরান ও উত্তর কোরিয়া দুটি বেয়াড়া দেশ; জ্বী, জি-৮ রাষ্ট্রসমূহ উদ্বিগ্ন হয়ে টেনশন করে এরা যদি কোনভাবে পটকা বানাতে পারে তাহলেই কেল্লা ফতে এবং তাই মূল টার্গেট যেকোন একটা উপায়ে লাল কার্ড ধরিয়ে তাদের খেলা থেকে বাদ দেওয়া। এছাড়া কেউ যেন তাদের সাথে না মেশে, ঈদ, পূঁজা-পার্বণ ও ক্রিসমাসে বেড়াতে না যায়, তারাও যেন যেতে না পারে। বিকিকিনি বাজারসদয় এসবও যেন না করতে পারে সেজন্য ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘকে দিয়ে তাদের উপর পটকা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কৌশল আরো জোরদার করানো হবে। সবশেষে, বিশ্ব অর্থনীতি ও তার উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা হবে। হান্টসভিলে সভাশেষে, সাংবাদিক ভাইবোনদেরকে সম্মেলন যে বিরাট সফল হলো সেটা জানানো হবে। তারপর টরোন্টোতে ফিরে জি-৮ নেতারা জি-২০ মানে ইর্মাজিং ইকোনোমির দেশগুলো চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতির নেতাদের সাথে আরেক দফা বসবেন। সেখানে বিশ্বের অর্থনৈতিক দূর্দশা নিয়ে আলোচনা হবে জাতিসংঘের মোড়লের উপস্থিতিতে। এজেন্ডাতে আরো আছে, টেকসই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন, ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার, আর্ন্তজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার যেমন বিশ্ব ব্যাংক এবং বানিজ্য উদারীকরণ বিষয়ক জনগুরুত্ত্বপূর্ন আলাপ-সালাপ – মূলতঃ সবই বাহাস। তারপর বেয়াড়া রাষ্ট্রগুলো কিকি বেয়াদপি করে তার লিস্টি পাঠ করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে উপরওয়ালার আদালতে নালিশ ঠোকা হবে। হারপার, সারকোজি, ক্যামেরুনসহ সকলে নানাধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনা করার পর এই সিদ্ধান্তে উপনিত হবে যে ওবামা যা যা বলেছে তা মোটামুটি সার্বিকভাবে তাদের বক্তব্যের প্রতিফলন। সবশেষে, জি-৮ এবং জি-২০ সবাই একসাথে বলবেন, হীরকের রাজা ভগবান। এরপর এয়ারফোর্স ওয়ান টরোন্টো থেকে ওয়াশিংটন উড়ে যাবে। আপাততঃ এইটুকুই জানি।

কাল রাতে সহজ কথায় জি-৮ বলতে যা শিখলাম তা হলো দাপটশালী পাঁচ গ্রামের মোড়ল মাতব্বর ফড়িয়াদের সমাবেশ যেখানে আলোচনা হয় কোন চাষাটা বেয়াড়া গোছের, কার বাড়ীর গরু বাছুর বিয়ালো, কোন বাড়ির মেয়েটা উঠতি, কোন নাড়ের বউ দেখতে সুন্দরী, কার বাড়ীর উঠোনে তরিতরকারী ফলিয়েছে, কার সাথে কার লাফড়া চলছে আর তাতে মোড়ল মাতব্বরদের কি স্বার্থ এসব আরকি।



পুলিশের কার জ্বলছে...

আজকে এখানেই শেষ করছি, কারণ লেখাটা এলোমেলো হচ্ছে। কাল এক এ্যান্টি-জি-৮ কর্মীর পোস্টারে দেখলাম: আমি একজন প্রতিবাদী, সন্ত্রাসী নই। এই মূহুর্তে টরোন্টোতে প্রতিবাদকারী ও পুলিশের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি চলছে। পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। টরোন্টো ডাউনটাউন এখন রণক্ষেত্র।

ছবিসূত্র:
ছবি ১ – অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল ব্লগস
ছবি ২ – সিবিসি নিউজ

দহন নিরবধি

অমাবশ্যা রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। কখনো একটানা, কখনো থেমে থেমে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। এদিকটায় লোকালয় কম, কিছুটা পথ দূরে স্টাফ কোয়ার্টার। একেবারে তিস্তার তীরে। রেস্ট হাউস আর তিস্তার মাঝে ঝাউবনে লিলুয়া বাতাস লুকোচুরি খেলে। সামনে কিছু ফলজ গাছ বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। একেকটা গাছের সামনে নামফলকে রোপনকারীর নাম এবং রোপনের তারিখ অবহেলায় সময়ের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে।

হুইস্কিটা একটু ধরলে দোতলার লাউঞ্জের ইজি চেয়ায়ে হেলান দেয়া অবস্থায় একটা ঢেকুর ওঠে খান সাহেবের। খাসির রেজালার ঝাঁঝটা একদম গলা পর্যন্ত জ্বলে ওঠে। মুখটা কুচঁকে বিকৃত করে ঝাঁঝালো তেতো স্বাদটা সামলান তিনি। ঈষৎ উঠে বসে, আরেক চুমুক পান করেন। তারপর ঘড়িটা একবার দেখে ভরাট গলায় অনুচ্চস্বরে ডাকেন,

- আক্কাস। আক্কাস।

এই ডাকের অর্থ আক্কাসের জানা। সে নিকটে দাড়িয়ে ছিল। খান সাহেবের হাত ধরে পাওয়া তিস্তা ব্যারেজে রেস্ট হাউসের চাকরি দশ বছর পেরোলো। তারও একযুগ আগে থেকে তার খেদমতের কাজ করেছে, তাই সাহেবের সব ইশারা তার নখদর্পনে। সবসময় সাহেবের সাথে মেহমান থাকে না। তখন সব ব্যবস্থা আক্কাসকেই করতে হয়।

- স্যার, সব রেডি আছে।
- কোন ঝামেলা করবে নাতো? দেখিস, গেলবারের মতো ভেজাল না করে। কান্নাকাটি একদম অসহ্য লাগে।
আক্কাস লজ্জিত হয়। জিভে কামড় কেটে বলে,
- না স্যার, এ্যারে সব বুঝায়ে দিছি। কোন ভেজাল হবার চান্স নাই এইবার। নিশ্চিন্ত থাকেন, স্যার। নতুন লাক্স সাবান কিনে দিসি আগে যাতে …
- কি নাম?
- স্যার, নাম হইলো তহমিনা।

ছোট সাইড টেবিলের উপর একটি জ্যাক ড্যানিয়েলের বোতল, প্রাণের অরেঞ্জ জুস, একটি পানির জগ, বেনসন এন্ড হেজেসের প্যাকেট, লাইটার, এ্যাশট্রে এবং একটি গ্লাস এলোমেলোভাবে ক্লান্ত প্রহর গুনে যাচ্ছিল। গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে একটু যেন টলতে থাকেন উঠে দাড়িয়ে খান সাহেব। তারপর নির্ধারিত ভিআইপি কক্ষের দিকে এগিয়ে যান।

সাত ভাইবোনের সংসার তহমিনাদের। বাপটা যক্ষায় পটল তুলেছে বছর তিনেক। খুব টানাপোড়ন। পেটে অনেক ক্ষিধে; পেটপুরে যে ভাত পায় না ঠিকমতো। বিশেষ করে মঙ্গার এই সময়টায়। ক্লাস এইট পাশ ভাইটার এমএলএসএস পদের চাকরিটার জন্য প্রথমে গার্ড বেলায়েত, তারপর কেয়ারটেকার আক্কাসের ঘর হয়ে শেষ পর্যন্ত খান সাহেবের হাতে।