Wednesday, August 18, 2010

যা শুনলাম, যা বুঝলাম

লজ্জাহীন ব্যস্ত তথা লজ্জা ঢাকিতে


গতকাল সকালে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠলাম। ব্রাজিল আর পর্তুগালের খেলা মিস করা যাবে না। তড়িঘড়ি করে কিচেনে টোষ্ট আর চা রেডি করছি। রুমমেট চার্লি হটাৎ জিজ্ঞাসা করলো, টরন্টো যাচ্ছো নাকি? মনে মনে বললাম, সকাল সকাল মাথা নষ্ট নাকি? তারপর খেয়াল হলো, জি-৮ / জি-২০ সামিট। এইটা নিয়ে স্টুডেন্ট ইউনিয়নে বেশ শোরগোল কদিন থেকে। অনেকেই অটোয়া থেকে সামিট প্রটেস্ট করতে টরন্টোমুখী। অনলাইনে স্টুডেন্টস এগেইনষ্ট জি-৮ সামিটের সিগনেচার ক্যাম্পেইন ফর্ম পাঠিয়েছিল, দায়সারাভাবে ফিলআপ করে দিয়েছি। ব্যস, এটুকুই। আমি বললাম, নাহ, যাচ্ছি না। চার্লিও যাচ্ছে না, কিন্তু ওর ইচ্ছা ছিল। তারপর সামিটের পলিটিক্যাল ইকোনমি নিয়ে ‌একদফা বেশ আলোচনা চললো কানাডার সরকার কিভাবে ট্যাক্সের পয়সা খরচা করে এদেশের নাগরিকদের অধিকার খর্ব করছে। মানে, টরন্টো কিভাবে একটা সুপার পোলিসিং সিটিতে রুপান্তরিত হয়ে আকষ্মিকভাবে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রতিহত করছে। মিলিয়ন ডলার খরচ করছে সম্মেলনের চারপাশের সিকিউরিটির জন্য মানে বেড়া দেওয়া আর কয়েক হাত পরপর পুলিশ দাঁড় করিয়ে রেখে। অন্টারিও প্রোভিন্সে পুলিশকে সাময়িকভাবে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সামিটের নিরাপত্তা বেড়ার আশপাশে কাউকে পরিচয়পত্র ছাড়া পাওয়া গেলে তৎক্ষনাত গ্রেফতার করার। এবং সেই আইনে গ্রেফতার করাও হয়েছে। বেশি ক্ষমতা পেলে অপব্যবহারও বেশি হয়, এখানেও তাই হচ্ছে সাধারন প্রতিবাদকারীকে সন্ত্রাসী হিসাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করা যে অধিকার, এবং প্রতিবাদ করলেই যে কেউ সন্ত্রাসী নয় পুলিশের আচরণে এই পার্থক্য উপেক্ষা করা হচ্ছে। ৮৫ বছর বয়ক্স এক হুইলচেয়ারে বসা প্রতিবাদকারীকে সন্ত্রাসী উল্লেখ করায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে। তাই বলে প্রতিবাদ থেমে নেই। এখানকার পুলিশের দূর্ভাগ্য যে এখানে গ্রেফতার বানিজ্য নেই, নইলে কিন্তু এই ‌‌ওছিলায় ভালোই আয় রোজগার হতো। যাইহোক, পুরো ব্যাপারটাই হলো মিলিয়ন ডলার শো ডাউন। চার্লির সাথে আলাপ আরো কিছুক্ষন চলতো, কিন্তু ব্রাজিল-পর্তুগাল ম্যাচ শুরু হয়ে যাচ্ছিল তাই ইতি টানা হলো। তখনই মনে পড়লো, গতবছর আমি যখন কোর্স সিলেকশনের সময় পলিটিক্যাল ইকোনমি কোর্স বেশি নিয়েছিলাম, চার্লি আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিল যে এজাতীয় কোর্স কিভাবে ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে প্রতিযোগী হিসাবে অবস্থান দূর্বল করে দেয়, কারণ পলিটিক্যাল ইকোনোমি সরকারের নীতিকৌশল ও কর্পোরেট বানিজ্য রাজনীতির কৌশলকে সমালোচনা ও প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সংগত কারনেই এমপ্লোয়ারদের কাছে পলিটিক্যাল ইকোনোমি ব্যাকগ্রাউন্ড কম প্রত্যাশিত তাই চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যায়।
.
জি-৮ অনেক বড়ো ব্যাপার। আমি বড় ব্যাপার স্যাপার নিয়ে সাধারনত মাথা ঘামাই না। তাহলে এটা মাথায় ঢুকলো কিভাবে? শুধুমাত্র বন্ধুবান্ধবের কানপড়া, ফেইসবুক আর মিডিয়া থেকে। আমার কয়েকজন বন্ধু আছে যারা বেশ জোরেশোরে এ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট। তারা সামিটের এজেন্ডার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করছে। নিয়মিত ফেইসবুকে আপডেট দিচ্ছে। সেটা দেখতে দেখতেই আমি মোটামুটি নিউজগুলো ফলো করা শুরু করে দিলাম। কাল রাতে আবিষ্কার করলাম আমি আর তোতান মিলে জি-৮ নিয়ে পলাশ ভড়ের সাথে মাঝরাতে অটোয়ার ডাউনটাউনের রাস্তায় গালগল্প করছি। জি-৮ সামিটের নিরাপত্তা জোনের চারপাশ ঘিরে যে বেড়া দেওয়া হয়েছে তাতে রেজারের ব্লেডের মতো ধার, তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। যা তা ব্যাপার নয়, টরোন্টো ডাউনটাউনের মেট্রো টরোন্টো কনভেনশন সেন্টারের চারপাশ জুড়ে ছয় কিলোমিটারব্যাপী তিন মিটার উঁচু এবং ছয় কিলোমিটার লম্বা এই বেড়ার খরচ পড়ছে ৫.৫ মিলিয়ন ডলার। জি-৮এবং জি-২০ সামিট মিলে ইতিহাসের সবথেকে ব্যয়বহুল সামিট হচ্ছে যেটাতে ১ বিলিয়ন ডলারের উপর খরচ করা হচ্ছে। এতো বড়ো পাবলিক ফান্ড বিভিন্ন খরচখরচাবাবদ সরাসরি মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেট সিকিউরিটি/মিলিটারি কোম্পানিগুলোর পকেটোস্থ হচ্ছে বলে সচেতন মানুষজন কানাডার সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করছে। তাই এই সামিটের সিকিউরিটি ওয়ালের নাম দেওয়া হয়েছে কর্পোরেট সিকিউরিটি ওয়াল। আমেরিকার ব্লাক ওয়াটার আর কানাডার এসএলসি লাভালিন নিরাপত্তার ঠিকাদারির বিডে জিতেছিল প্রথমে, সেখান থেকে মন্ট্রিয়ালভিত্তিক এসএলসি লাভালিন নিরাপত্তা ঠিকাদারীটা পায়, যারা কিনা আফগানিস্থানে ন্যাটো বাহিনীর দখলদারিত্ত্বের পরিবেশ সহায়ক করতে অবকাঠামো ও অন্যান্য ঠিকাদারীর কাজ করে। তারা ইরাক যুদ্ধেও একই ব্যবসা করেছে। তার মানে দাড়ায়, এসএলসি লাভালিন ন্যাটো বাহিনীকে সহায়তা করে মূলতঃ আফগানদের সমসাময়িক জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্যাতন, দারিদ্রতা এবং সংঘর্ষ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কানাডার মানুষজনের প্রশ্ন হচ্ছে সরকার দেশের মানুষের পয়সায় নিজের দেশের মানুষের বাক ও নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার মতো ভাড়ামিটা কেন করছে? এই অধিকার সরকারের আছে কিনা? সবশুনে আমি মনে মনে বলি, ব্যাক্কল নাকি?! সরকার বাহাদুর চাইলে সব করতে পারে।
নিরাপত্তা ব্যাপারটা একটা জুজু ছাড়া আর কিছু না। এই জুজুর ভয় দেখিয়ে কত মৃর্ত্যু জায়েজ করা হচ্ছে সমসাময়িক পৃথিবীতে সেই পরিসংখ্যানের কোন রেকর্ড নেই। বিশ্বে তথাকথিত শান্তিশৃঙ্খলা ঠিক আছে কিনা তা নিয়ে জি-৮ দেশের মাথা ব্যথার শেষ নেই। তাই তারা আফগানিস্থান, ইরাক, ইরান, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশ নিয়ে চিন্তিত, সেসব জায়গার পরামানু অস্ত্র, সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, সংগঠিত অপরাধ এবং মানব ও মাদক পাচার নিয়ে গলদঘর্ম। মজার ব্যাপার হলো, জি-এইট দেশগুলোর প্রত্যেককেই এই একই বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু সেখানেই কবি নীরব! আমাদেরকে শেখানে হয়েছে, ইরান ও উত্তর কোরিয়া দুটি বেয়াড়া দেশ; জ্বী, জি-৮ রাষ্ট্রসমূহ উদ্বিগ্ন হয়ে টেনশন করে এরা যদি কোনভাবে পটকা বানাতে পারে তাহলেই কেল্লা ফতে এবং তাই মূল টার্গেট যেকোন একটা উপায়ে লাল কার্ড ধরিয়ে তাদের খেলা থেকে বাদ দেওয়া। এছাড়া কেউ যেন তাদের সাথে না মেশে, ঈদ, পূঁজা-পার্বণ ও ক্রিসমাসে বেড়াতে না যায়, তারাও যেন যেতে না পারে। বিকিকিনি বাজারসদয় এসবও যেন না করতে পারে সেজন্য ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘকে দিয়ে তাদের উপর পটকা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কৌশল আরো জোরদার করানো হবে। সবশেষে, বিশ্ব অর্থনীতি ও তার উন্নয়ন বিষয়ক আলোচনা হবে। হান্টসভিলে সভাশেষে, সাংবাদিক ভাইবোনদেরকে সম্মেলন যে বিরাট সফল হলো সেটা জানানো হবে। তারপর টরোন্টোতে ফিরে জি-৮ নেতারা জি-২০ মানে ইর্মাজিং ইকোনোমির দেশগুলো চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল প্রভৃতির নেতাদের সাথে আরেক দফা বসবেন। সেখানে বিশ্বের অর্থনৈতিক দূর্দশা নিয়ে আলোচনা হবে জাতিসংঘের মোড়লের উপস্থিতিতে। এজেন্ডাতে আরো আছে, টেকসই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন, ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার, আর্ন্তজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার যেমন বিশ্ব ব্যাংক এবং বানিজ্য উদারীকরণ বিষয়ক জনগুরুত্ত্বপূর্ন আলাপ-সালাপ – মূলতঃ সবই বাহাস। তারপর বেয়াড়া রাষ্ট্রগুলো কিকি বেয়াদপি করে তার লিস্টি পাঠ করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে উপরওয়ালার আদালতে নালিশ ঠোকা হবে। হারপার, সারকোজি, ক্যামেরুনসহ সকলে নানাধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনা করার পর এই সিদ্ধান্তে উপনিত হবে যে ওবামা যা যা বলেছে তা মোটামুটি সার্বিকভাবে তাদের বক্তব্যের প্রতিফলন। সবশেষে, জি-৮ এবং জি-২০ সবাই একসাথে বলবেন, হীরকের রাজা ভগবান। এরপর এয়ারফোর্স ওয়ান টরোন্টো থেকে ওয়াশিংটন উড়ে যাবে। আপাততঃ এইটুকুই জানি।

কাল রাতে সহজ কথায় জি-৮ বলতে যা শিখলাম তা হলো দাপটশালী পাঁচ গ্রামের মোড়ল মাতব্বর ফড়িয়াদের সমাবেশ যেখানে আলোচনা হয় কোন চাষাটা বেয়াড়া গোছের, কার বাড়ীর গরু বাছুর বিয়ালো, কোন বাড়ির মেয়েটা উঠতি, কোন নাড়ের বউ দেখতে সুন্দরী, কার বাড়ীর উঠোনে তরিতরকারী ফলিয়েছে, কার সাথে কার লাফড়া চলছে আর তাতে মোড়ল মাতব্বরদের কি স্বার্থ এসব আরকি।



পুলিশের কার জ্বলছে...

আজকে এখানেই শেষ করছি, কারণ লেখাটা এলোমেলো হচ্ছে। কাল এক এ্যান্টি-জি-৮ কর্মীর পোস্টারে দেখলাম: আমি একজন প্রতিবাদী, সন্ত্রাসী নই। এই মূহুর্তে টরোন্টোতে প্রতিবাদকারী ও পুলিশের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি চলছে। পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। টরোন্টো ডাউনটাউন এখন রণক্ষেত্র।

ছবিসূত্র:
ছবি ১ – অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল ব্লগস
ছবি ২ – সিবিসি নিউজ

No comments:

Post a Comment